প্রকাশের তারিখ : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
দুপচাঁচিয়ায় বাঁশশিল্পের দুই কারিগর বার্ধক্য ও প্রতিকূলতা জয় করে আত্মমর্যাদার লড়াই
শরীরে বার্ধক্যের ছাপ, চোখেমুখে বয়সের বলিরেখা। তবু থেমে নেই হাতের কাজ। বয়সের ভার আর সংসারের টানাপোড়েনকে উপেক্ষা করে বাঁশের বুননে জীবিকার পথ তৈরি করে চলেছেন বগুড়ার দুপচাঁচিয়ার দুই প্রবীণ কারিগর—রুস্তম আলী ও গীরেন বৈরাগী। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে ঐতিহ্যবাহী বাঁশশিল্পের সঙ্গে যুক্ত এই দুই কারিগর কারও করুণার ওপর নির্ভর না করে নিজেদের শ্রম ও দক্ষতায় সচল রেখেছেন জীবনের চাকা।প্লাস্টিক,অ্যালুমিনিয়াম ও আধুনিক নানা সামগ্রীর দাপটে গ্রামীণ ঐতিহ্যের অনেক কুটিরশিল্প আজ সংকটের মুখে। এর মধ্যেও বাঁশের তৈরি পরিবেশবান্ধব পণ্যের চাহিদা ধরে রেখেছেন তাঁরা। তাঁদের হাতের নিপুণ কারুকাজে তৈরি হচ্ছে গ্রামীণ জীবন ও গৃহস্থালির প্রয়োজনীয় নানা সামগ্রী। বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার নলডুবি গ্রামের বাসিন্দা রুস্তম আলী ছোটবেলায় বাবার হাত ধরে বাঁশশিল্পের সঙ্গে যুক্ত হন। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় বাঁশ কাটানো, চেঁছে নেওয়া, মাপ অনুযায়ী প্রস্তুত করা এবং বুননের কাজে এখন তিনি দক্ষ কারিগর।প্রায় ২৫ বছর ধরে দুপচাঁচিয়ার ঐতিহ্যবাহী ধাপ সুলতানগঞ্জ হাটে নিজের তৈরি বাঁশপণ্য বিক্রি করছেন তিনি। প্রতিদিন ভোরে ঘুম থেকে উঠে শুরু হয় তাঁর কর্মযজ্ঞ। বয়স বাড়লেও কাজের প্রতি আগ্রহে ভাটা পড়েনি।বা শিল্পের আরেক কারিগরদুপচাঁচিয়া পৌরসভার পালপাড়ার বাসিন্দা ৭৬ বছর বয়সী গীরেন বৈরাগী তিন দশকের বেশি সময় ধরে বাঁশশিল্পের সঙ্গে যুক্ত। বয়সের ভারে শরীর আগের মতো সায় না দিলেও কাজের প্রতি ভালোবাসা তাঁকে এখনও টেনে নিয়ে যায় কর্মস্থলে।বাঁশের পণ্য তৈরির পাশাপাশি তিনি হিন্দু সনাতন ধর্মের নামসংকীর্তন পরিবেশন করেও কিছুটা বাড়তি আয় করেন। জীবনের নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজের শ্রমে সংসার চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন তিনি।বাঁশের পণ্যে গ্রামীণ জীবনের ছোঁয়ারুস্তম ও গীরেনের দক্ষ হাতে তৈরি হয় মই, চাটাই, ঝুড়ি, ডালা, কুলা, চালুনি, মাছ ধরার চাঁই ও বিভিন্ন ধরনের ফাঁদসহ নানা পণ্য। বাঁশের পাশাপাশি তাল ও ডাবের পাতা এবং খাগড়ার মতো প্রাকৃতিক উপকরণ ব্যবহার করে তাঁরা তৈরি করেন টেকসই ঝাড়ুও।স্থানীয় হাটের পাশাপাশি দূর-দূরান্তের ক্ষুদ্র ও পাইকারি ব্যবসায়ীরাও তাঁদের কাছ থেকে এসব পণ্য কিনে নিয়ে যান। ফলে স্থানীয় বাজারের গণ্ডি পেরিয়ে তাঁদের তৈরি হস্তশিল্পের কিছুটা হলেও বিস্তার ঘটেছে।কাঁচামালের দাম বাড়ায় বাড়ছে সংকটতবে ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত কারিগরদের জীবনযাপন সহজ নয়। কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং আধুনিক প্লাস্টিক ও অ্যালুমিনিয়ামের পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতার কারণে তাঁদের আয় সীমিত হয়ে পড়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বয়সজনিত শারীরিক দুর্বলতা।তারপরও থেমে যেতে চান না তাঁরা। সীমিত আয় ও নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজেদের শ্রমের ওপর আস্থা রেখেছেন দুই প্রবীণ কারিগর।রুস্তম আলী বলেন, “দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে এই হাটে পণ্য বিক্রি করছি। কারও কাছে হাত না পেতে নিজের মেহনতেই শেষ দিন পর্যন্ত মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকতে চাই।”গীরেন বৈরাগী বলেন, “বয়সের কারণে শরীর আর আগের মতো সায় দেয় না। দ্রুত অবসাদ আসে। তবু কারও কাছে হাত না পেতে নিজের মেহনতেই শেষ দিন পর্যন্ত মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকতে চাই।”প্লাস্টিকনির্ভর আধুনিক জীবনের ভিড়ে বাঁশের ঐতিহ্যবাহী পণ্য এখন অনেকটাই পিছিয়ে পড়েছে। তারপরও রুস্তম আলী ও গীরেন বৈরাগীর মতো কারিগররা নিজেদের শ্রম, দক্ষতা ও আত্মমর্যাদাকে সম্বল করে এই শিল্পকে টিকিয়ে রেখেছেন। তাঁদের জীবনসংগ্রাম শুধু একটি হারিয়ে যেতে বসা কুটিরশিল্পের গল্প নয়; এটি প্রতিকূলতার মধ্যেও শ্রমের মর্যাদা ও আত্মনির্ভরতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
কপিরাইট © ২০২৬ Daily Joypur Barta । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত