প্রকাশের তারিখ : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
গ্রামীণ নাপিতের ঐতিহ্য: শিকড় আঁকড়ে দুই প্রবীণের অনন্য লড়াই
যুগের হাওয়ায় বদলে গেছে রূপ, বদলেছে মানুষের রুচি ও সেবা গ্রহণের ধরন। ডিজিটাল ছোঁয়া আর আধুনিকতার চটকদার স্রোতে গ্রামের আঁকাবাঁকা মেঠোপথ থেকে শুরু করে হাট-বাজারের চিত্রে এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। আধুনিক সভ্যতার দ্রুত রূপান্তরের ভিড়ে ধূলিসাৎ হতে বসেছে গ্রামবাংলার শতবর্ষী সব ঐতিহ্যবাহী পেশা। তবে এই আমূল পরিবর্তনের যুগেও নিজের শিকড়, আত্মপরিচয় ও বংশানুক্রমিক ঐতিহ্যকে আঁকড়ে ধরে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন বগুড়ার দুপচাঁচিয়ার চামরুল ইউনিয়নের কুড়িপাড়া গ্রামের হারান শীল (৭৬),ও কালাই ঠিওথ গ্রামের বিকাশ শীল (৬৭)। ঐতিহাসিক ধাপ সুলতানগঞ্জ হাটে প্রবীণ এই দুই কারিগর আজও পরম মমতায় বাঁচিয়ে রেখেছেন ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ নাপিতের পেশাটিকে।দীর্ঘ ৪৫ বছর ধরে দুপচাঁচিয়া উপজেলার আনাচে-কানাচে ঘুরে কিংবা ঐতিহ্যবাহী ধাপ সুলতানগঞ্জ হাটে বসে গ্রামের হাজারো মানুষের চুল-দাড়ি কাটার কাজ পরিচালনা করে আসছেন হারান ও বিকাশ শীল। একসময় গ্রামবাংলায় হাটে-বাজারে, বট কিংবা অশ্বত্থের ছায়ায়, কিংবা গৃহস্থের খোলামেলা উঠানে একটি কাঠের পিঁড়িতে বসে কাঠের বাক্সে ধারালো খুর, কাঁচি, চিরুনি, জং-ধরা দর্পণ আর চামড়ার ফিতা নিয়ে নাপিতদের উপস্থিতি ছিল নিত্যদিনের সুপরিচিত দৃশ্য। তবে কালক্রমে অলিতে-গলিতে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত ও আধুনিক সাজসজ্জার ঝলমলে রিভলভিং চেয়ারের সেলুন গজালেও হারান ও বিকাশ শীল কোনো চটকদার আলোক ছটায় হারিয়ে যাননি। আধুনিকতার আগ্রাসনে হারিয়ে না গিয়ে বরং আজও সহজ-সরল গ্রামীণ কায়দায় বংশানুক্রমিক এই কাজকে তারা সগৌরবে ধরে রেখেছেন।হারান শীলের কাছে এই কাজ কেবল নিছক জীবিকা নির্বাহের উপায় নয়, এটি তার পূর্বপুরুষদের রেখে যাওয়া পরম আমানত ও আত্মমর্যাদার প্রতীক। জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে গিয়ে কিছুটা আবেগে আপ্লুত হয়ে এই প্রবীণ রূপকার বলেন, "১৭ বছর বয়স থেকেই বাবার হাত ধরে বিভিন্ন হাটে-বাজারে চুল ও দাড়ি কাটার কাজে হাত দিতাম। তখনকার সময়ে চুল কাটার মজুরি ছিল মাত্র ৫ টাকা আর দাড়ি কাটার ৩ টাকা। তখনকার দিনগুলো অন্যরকম ছিল, কম টাকাতেও মানুষের মনে শান্তি ছিল। বর্তমানে দ্রব্যমূল্যের চরম ঊর্ধ্বগতির যুগে চুল কাটার মজুরি ২০-৩০ টাকা এবং দাড়ি কাটার জন্য ১০-১৫ টাকা নেওয়া হয়। তবে পরিবারের সদস্য বেশি হওয়ায় আর হাটে অল্প মজুরি মেলায় দিনশেষে এই সামান্য আয়ে সংসার চালানো এখন ভীষণ কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে।"আধুনিক যুগে মানুষ যখন ক্রমশ যান্ত্রিক ও আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়ছে, সেখানে এই প্রবীণ নাপিতেরা কেবল হাটের মধ্যেই নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখেননি। গ্রামবাংলায় সম্পর্কের যে মানবিক বন্ধন থাকে, খবর পেলেই তারা ছুটে যান পরিচিত মানুষের বাড়ি বাড়ি। বিশেষ করে বয়সের ভারে নুয়ে পড়া প্রবীণ, শয্যাশায়ী কিংবা অসুস্থ মানুষদের ঘরে গিয়ে পরম যত্নে ও ভালোবাসায় সেবা দেন তারা।কাজের প্রতি ভালোবাসার কথা ফুটিয়ে তুলতে গিয়ে বিকাশ শীল বলেন, "আধুনিকতার কারণে মানুষের রুচি ও চাওয়া-পাওয়ায় অনেক পরিবর্তন এসেছে ঠিকই, কিন্তু আমি আমার শিকড় ও বাবার শেখানো কাজকে ভুলতে পারিনি। যতদিন শরীরে শক্তি আছে এবং হাত কাঁপবে না, ততদিন প্রবীণদের রেখে যাওয়া এই পবিত্র কাজ আঁকড়ে থাকতে চাই। আধুনিক সেলুনে হয়তো অনেক সুবিধা আছে, কিন্তু গ্রামের মানুষের কাছাকাছি গিয়ে সেবা করার মধ্যে যে ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও আত্মতৃপ্তি আছে, তা কোটি টাকা দিয়েও কেনা সম্ভব নয়।"স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দা ও সমাজসেবকদের মতে, আধুনিক সভ্যতার অতল গহ্বরে যখন গ্রামবাংলার লোকজ সংস্কৃতি ও প্রাচীন পেশাগুলো একে একে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে, তখন হারান ও বিকাশ শীলের মতো প্রবীণদের এমন একনিষ্ঠ চেষ্টা অত্যন্ত প্রশংসনীয় ও অনুকরণীয়।তাদের এই পথ চলা কেবল দুজন প্রান্তিক পেশাজীবীর জীবনসংগ্রাম ও পেটের তাগিদের গল্প নয়; বরং এটি রূপান্তরকামী ও আধুনিকতার দিকে ধাবমান গ্রামীণ সমাজের বুকে প্রাচীন ঐতিহ্য, হারিয়ে যাওয়া মূল্যবোধ ও শতবর্ষী লোকজ সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখার এক অমলিন, চিরভাস্বর ও জীবন্ত দলিল।
কপিরাইট © ২০২৬ Daily Joypur Barta । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত