প্রকাশের তারিখ : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
যুক্তরাষ্ট্রের পাঁচ দিনের সফর কি কি করলেন প্রধানমন্ত্রী
জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পাঁচ দিনের সফর শেষ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সরকার গঠনের পর জাতিসংঘে এটি ছিল তার প্রথম সফর। সফর ঘিরে তার বিভিন্ন কর্মসূচি, দ্বিপক্ষীয় বৈঠক,আন্তর্জাতিক ইস্যুতে বক্তব্য এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা ও চুক্তি নিয়ে আলোচনা হয়েছে।প্রধানমন্ত্রী যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করার সময়ই মার্কিন উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের সঙ্গে ১১টি বিমান কেনার চুক্তি করেছে বাংলাদেশ। সফরের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারকও সই হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সফরে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, জনশক্তি রপ্তানি, জ্বালানি নিরাপত্তা, আঞ্চলিক সহযোগিতা, রোহিঙ্গা সংকট, স্বাস্থ্য, জলবায়ু ও আন্তর্জাতিক শান্তিসহ বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে।প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন নিউইয়র্কে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, সফরকালে প্রধানমন্ত্রী ১১টি দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেছেন। পাশাপাশি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ভাষণ দেওয়ার পাশাপাশি ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য এবং প্রায় ৩০টি আন্তর্জাতিক কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন তিনি।মাহদী আমিন বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে সময়ের সর্বোচ্চ ব্যবহার করা হয়েছে এবং প্রতিটি কর্মসূচিতে বাংলাদেশের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সরকারপ্রধান হিসেবে তারেক রহমানের প্রথম জাতিসংঘ সফর হওয়ায় এ সফরের দিকে বিশেষ নজর ছিল। দেশের পাশাপাশি বৈশ্বিক বিভিন্ন ইস্যুতে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরার এবং তার সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রত্যাশা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা ছিল সফরের বিভিন্ন কর্মসূচিতে।রোহিঙ্গা সংকট : দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতির অবসানে ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিসহ টেকসই সমাধানের আহ্বান’ শীর্ষক একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক যৌথভাবে আয়োজন করে বাংলাদেশ ও গাম্বিয়া। ওই বৈঠকে রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানে পাঁচ দফা প্রস্তাব দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সতর্ক করে বলেন, রোহিঙ্গা সংকট পুরো অঞ্চলের জন্য নিরাপত্তাজনিত চ্যালেঞ্জে পরিণত হতে পারে।যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির বলেন, প্রধানমন্ত্রী অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে বক্তব্য দিয়েছেন। রোহিঙ্গা সংকটের পাশাপাশি জলবায়ু ন্যায়বিচারের বিষয়টিও তার বক্তব্যে এসেছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়িত্ব এবং তারা কীভাবে এ ক্ষেত্রে কাজ করতে পারে, সে বিষয়েও প্রধানমন্ত্রী কথা বলেছেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।সফরে প্রধানমন্ত্রী মোট সাতটি বক্তব্য দেন। এর মধ্যে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের মূল অধিবেশনে দেওয়া ভাষণ ছাড়াও সাইডলাইনের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে চারটি, বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশে একটি এবং উন্নয়ন সহযোগীদের একটি অনুষ্ঠানে একটি বক্তব্য দেন তিনি।এ ছাড়া কুয়েতের ক্রাউন প্রিন্স, সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের উপপ্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী।সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এসব বৈঠকে জনশক্তি রপ্তানি, জ্বালানি নিরাপত্তা, খনিজ খাতে সহযোগিতা এবং বাংলাদেশে বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।এর বাইরে বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট, জাতিসংঘের মহাসচিব, মিয়ানমারবিষয়ক জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূত, জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার হাইকমিশনার এবং জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকের কথা জানিয়েছেন মাহদী আমিন।সরকার বলছে, এসব বৈঠকে বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় তুলে ধরার পাশাপাশি জনগণের সঙ্গে জনগণের যোগাযোগ, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং পারস্পরিক সহযোগিতা জোরদারের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি অংশগ্রহণ না থাকলেও সফরের শুরুতেই যুক্তরাষ্ট্রের বোয়িং কোম্পানি থেকে আরো ১১টি বিমান কেনার চুক্তি করে বাংলাদেশ।এ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকেও ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে বলা হয়, বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ বাণিজ্যিক উড়োজাহাজ নির্মাতা বোয়িংয়ের কাছ থেকে আরো ১১টি বিমান কেনার চুক্তিতে বোয়িং ও বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসকে অভিনন্দন। যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ সম্পর্কের জন্য এটিকে আরেকটি অর্জন হিসেবে উল্লেখ করে দূতাবাসটি বলেছে, এতে দুই দেশই লাভবান হবে।চুক্তি স্বাক্ষরের পর নিউইয়র্কে সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেন, বিমান পরিবহন খাত সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় রেখেই নতুন উড়োজাহাজ কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।তবে ইরান যুদ্ধসহ বিভিন্ন কারণে সরকার যখন অর্থনৈতিক চাপের কথা বলছে, সেই সময়ে নতুন করে বিপুল অর্থ ব্যয় করে বিমান কেনার সিদ্ধান্ত কতটা যৌক্তিক—এ নিয়ে সমালোচনাও রয়েছে।এর আগে চলতি বছরের ৩০ এপ্রিল ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের সঙ্গে বোয়িংয়ের একটি চুক্তি সই হয়েছিল। তখন বোয়িং থেকে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার কথা জানানো হয়েছিল।প্রধানমন্ত্রীর সফরের শেষ পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়। বাংলাদেশ সময় শনিবার ভোরে বিএনপি মিডিয়া সেলের ভেরিফায়েড মাধ্যমে এ তথ্য জানানো হয়।বাংলাদেশের পক্ষে প্রধানমন্ত্রীর টেলিযোগাযোগ ও আইসিটি বিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসাদ এবং যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, জ্বালানি ও পরিবেশবিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি জ্যাকব হেলবার্গ সমঝোতা স্মারকে সই করেন।বাংলাদেশে রাশিয়ার সহযোগিতায় দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণকাজ চলমান রয়েছে। এর মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক সহযোগিতা বাড়ানোর এই সমঝোতা হয়েছে।সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবিরের মতে, বাংলাদেশ ও বৈশ্বিক বিভিন্ন বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে বাংলাদেশের মানুষের প্রত্যাশার কথা তুলে ধরেছেন।তিনি বলেন, সাধারণ পরিষদের অধিবেশন, সাইডলাইন বৈঠক ও উচ্চপর্যায়ের বৈঠকগুলোতে রোহিঙ্গা সংকট, অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার ও জলবায়ু ন্যায়বিচারসহ বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে। তার মতে, প্রধানমন্ত্রী একই সঙ্গে দেশের অভ্যন্তরীণ শ্রোতা ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে বক্তব্য দিয়েছেন।হুমায়ুন কবির বলেন, সরকার গঠনের পর এটিই প্রধানমন্ত্রীর এ ধরনের প্রথম সফর। ফলে বিভিন্ন ইস্যুতে তার অবস্থান তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হয়েছিল। তিনি মনে করেন, নিজে একটি সংবাদ সম্মেলন করলে সফরের লক্ষ্য কতটা অর্জিত হয়েছে সে বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর নিজস্ব মূল্যায়ন জানা যেত। তবে লক্ষ্য, গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সম্পৃক্ত করার যে চেষ্টা ছিল, তা তিনি ইতিবাচক বলে উল্লেখ করেন।আরেক সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমেদ বলেন, প্রধানমন্ত্রী সাধারণ পরিষদে যে ভাষণ দিয়েছেন, সেখানে বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো এসেছে। পরিবর্তনগুলো তুলে ধরে বাংলাদেশ কী ধরনের সহযোগিতা আশা করছে, সেটিও তিনি জানিয়েছেন।তিনি বলেন, দ্বিপক্ষীয় বিষয়েও বেশ কিছু আলোচনা হয়েছে। মাত্র কয়েক মাস বয়সী সরকারের জন্য বিভিন্ন দেশের সঙ্গে এ ধরনের যোগাযোগ গুরুত্বপূর্ণ। তার মতে, এই সফরের মাধ্যমে সরকারের আন্তর্জাতিক পরিসরে যোগাযোগ বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হয়েছে।সব মিলিয়ে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে অংশ নেওয়া, বিভিন্ন দেশের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক, রোহিঙ্গা সংকট ও জলবায়ু ন্যায়বিচার নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরা, বিনিয়োগ ও বাণিজ্য বাড়ানোর আহ্বান এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিমান ও পারমাণবিক সহযোগিতার বিষয়ে দুটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি ও সমঝোতা—এসবই তারেক রহমানের পাঁচ দিনের যুক্তরাষ্ট্র সফরের উল্লেখযোগ্য দিক হিসেবে সামনে এসেছে। সূত্র : বিবিসি
কপিরাইট © ২০২৬ Daily Joypur Barta । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত