প্রকাশের তারিখ : ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
গুইমারায় শহীদদের স্মরণে আনুষ্ঠানিক সম্মান প্রদর্শন ও স্মরণসভা
গুইমারা ছাত্র-যুবসমাজের গর্ব তিন বীর শহীদকে স্যালুট!জনগণের জন্য যারা জীবন দেন, তাদের স্মৃতি অম্লান "- এই শ্লোগানকে সামনে রেখে শহীদ আক্রই-আথুই ও থৈইচিং-এর প্রতি আনুষ্ঠানিক সম্মান প্রদর্শন ও স্মরণ সভা করেছে শহীদ স্মৃতি সংরক্ষণ সংসদ ও ছাত্র-জনতা সংগ্রাম পরিষদ। সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর ২৬ইং) সকালে গুইমারা রামসু বাজার সংলগ্ন এলাকায় এ স্মরণসভা অনুষ্ঠিত হয়।স্মরনসভায় ছাত্র জনতা সংগ্রাম পরিষদ এর সভাপতি উষাতন চাকমার সভাপতিত্বে বক্তব্য রাখেন, শহীদ স্মৃতি সংরক্ষণ সংসদ-এর সভাপতি রুপসি চাকমা (শহীদ জুনান চাকমা'র মা) , লক্ষীছড়ি ১ নং ইউপি চেয়ারম্যান প্রবীল কুমার চাকমা, লক্ষীছড়ি কার্বারী এসোসিয়েশনের সভাপতি রতন বিকাশ চাকমা, সুধুঅং মারমা সাবেক মেম্বার সিন্দুকছড়ি এবং দূল্যাতলী ইউনিয়ন চেয়ারম্যান ত্রিলোন চাকমা। এতে সংহতি জানিয়ে আরো বক্তব্য রাখেন, হিল উইমেন্স ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় প্রতিনিধি রেশমি মারমা।স্মরণসভা শুরুর আগে একটি চৌকস টিম তিন বীর শহীদের প্রতিকৃতি স্থাপন করেন এবং অস্থায়ী স্মৃতিস্তম্ভে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পন করা হয়।শহীদ পরিবারের পক্ষ থেকে শহীদ আথৈইপ্রুর মা নুনুমা মারমা ও শহীদ আখ্র মা ক্রাথং মারমা শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করেন। শহীদ স্মৃতি সংরক্ষণ সংসদের পক্ষ থেকে রূপসি চাকমা (শহীদ জুনানের মা) ও শহীদ রুবেলের মা শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পন করেন। এছাড়া ইউনাইটেড পিপলস্ ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)-এর সংগঠক অংক্যচিং মারমা, পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ (পিসিপি) -এর কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক অনিমেষ চাকমা, হিল উইমেন্স ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় প্রতিনিধি রেশমি মারমা, গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক বরুণ চাকমা, ছাত্র-জনতা সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে উষাতন চাকমা ও অগ্রণী শিশু-কিশোর কেন্দ্রের শিশু কিশোররা অস্থায়ী স্মৃতিস্তম্ভে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পন করেন। শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন শেষে শহীদদের স্মরণে সাইরেন বাজিয়ে ২ মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। নীরবতা পালন শেষে শপথ বাক্য পাঠ করান সাধারণ শিক্ষার্থী সুমনা মারমা। একই সাথে স্মরণসভায় উপস্থিত ছাত্র-জনতা সকলেই কালো ব্যাজ ধারণ করেন।রুপসি চাকমা বলেন, ২০২৪ সালে ১৯ সেপ্টেম্বর সেনাবাহিনীর গুলিতে নিহত হন শহীদ জুনান চাকমা ও রুবেল ত্রিপুরা। শহীদ জুনান চাকমা আমার বড় ছেলে। শহীদ হওয়ার আগে আমাকে বলে গিয়েছিলেন, " মা, দীঘিনালায় ঘর পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে এখানেও দিতে পারে, আমাকে যেতে হবে পাহাড়া দিতে। তুমি ঘুমাও আমি চলে আসব"। কিন্তু সে ফিরে এসেছিল লাশ হয়ে। সেনাবাহিনীরা তাকে গুলি করে হত্যা করেছিল।তিনি আরো বলেন, আমার ছেলে শহীদ জুনান চাকমা নিজেকে ও নিজের ভিটেমাটি রক্ষা করতে গিয়ে সেনাবাহিনীর গুলিতে প্রাণ হারিয়েছেন যার বিচার আমি এখনো পাইনি। আমি বিভিন্নভাবে চেষ্টা করছি আমার ছেলের হত্যার বিচার পাওয়ার কিন্তু আমাকে বারবার নিরাশ হতে হচ্ছে।তিনি অতি দ্রুত শহীদ জুনান, রুবেল, অনিক, ধনঞ্জয় ও রামেসু বাজারে সংগঠিত হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবি জানান।প্রবীল কুমার চাকমা বলেন , ২০২৫ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর গুইমারা রামেসু বাজার অগ্নিসংযোগ ও সেনাবাহিনীর গুলিতে আক্রই,অথুই ও থৈচিং মারমা শহীদ হন। একই সাথে এ ঘটনায় অনেকেই আহত হন। খাগড়াছড়ি চিঙ্গিনালায় এক মারমা স্কুল ছাত্রী ধর্ষণের শিকার হলে তার প্রতিবাদ করতে গিয়ে এ নৃশংস ঘটনা সংঘটিত করা হয় । ঘটনার এক বছর অতিবাহিত হলেও ঘটনার সাথে জড়িত কাউকেই এখনো গ্রেফতার করা হয় নি।রতন বিকাশ চাকমা বলেন, আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। শাসকশ্রেণী যে বিভাজনের রাজনীতি তৈরি করেছে তা ভেস্তে দিতে হবে।ত্রিলোন চাকমা বলেন, যুগ যুগ ধরে পাহাড়িদের নির্যাতন নিপীড়নের মধ্যে রাখা হয়েছে। নানান প্রতিকুলতার মধ্যে দিয়ে আমাদের পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে। যখন কোনো অন্যায় দমন-পীড়নের প্রতিবাদ করা হয় তখন সন্ত্রাসী, বিচ্ছিন্নতাবাদী তকমা দিয়ে আন্দোলন দমনের চেষ্টা করা হয়।তিনি আরো বলেন, ২০১১ সালে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বাঙালি জাতীয়তাবাদ চাপিয়ে দিয়ে আমাদের জাতিসত্তার পরিচয় মুছে দেয়া হয়েছে এবং আমাদেরকে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে।রেশমি মারমা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের বিচারব্যবস্থা এমন এক পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে যেখানে ধর্ষিতা বোনের বিচার চাইতে গিয়েও আমাদেরকে জীবন দিতে হচ্ছে। প্রশাসন ধর্ষকদের গ্রেফতার না করে উল্টো ভিক্টিমকে নানান চাপের মধ্যে রাখার চেষ্টা করে। তিনি উদ্বেগ জানিয়ে বলেন, দেশে এমন এক বিচারহীনতার সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে যেখানে ন্যায়বিচার পাওয়া অসম্ভব। এমতাবস্থায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কিংবা বাড়িতে যেকোনো জায়গায় আজ নারীরা নিরাপদ নয়।তিনি আরো বলেন, পাহাড়িদের ন্যায্য অধিকার না থাকার কারণে আজকে অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গেলে দমন-পীড়নের শিকার হতে হয় । ১৯৯৬ সালে কল্পনা চাকমাকেও অধিকারের কথা বলতে গিয়ে লে. ফেরদৌস গঙ কর্তৃক অপহরণ ও গুমের শিকার হতে হয়েছিল। যার হদিস আমরা এখনো পাইনি। তিনি রামেসু বাজারের হত্যাকাণ্ডসহ পার্বত্য চট্টগ্রামের সংঘটিত সকল হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবি জানান।সুধুঅং মারমা বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন যে পার্বত্য চট্টগ্রামে শতভাগ মানবাধিকার দেয়া সম্ভব নয়। তার একটি উদাহরণ হচ্ছে গুইমারা রামেসু বাজারের ঘটনা। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বক্তব্যে স্পষ্টই প্রকাশ পায়, পাহাড়ি নারী ধর্ষণের শিকার হলে তার বিচার হবে না আর ধর্ষণের বিচার চাইতে গেলেই নৃশংসতার শিকার হতে হবে।তিনি আরো বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে ডজনের অধিক গণহত্যা সংঘটিত করা হয়েছে। শত শত মা-বোনদের সম্ভ্রম লুট করা হয়েছে, ভিটেমাটি দখল করা হয়েছে যার কোনোটিরই সুষ্ঠু বিচার আমরা পাইনি। তিনি রামেসু বাজারের অগ্নিসংযোগ - হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করেন।সভাপতির বক্তব্যে উষাতন চাকমা বলেন, বোনের ধর্ষণের বিচার চাইতে গিয়ে শহীদ হয়েছেন আক্রই-আথুই ও থৈইচিং মারমা। একই সাথে রামেসু বাজারে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে । এ ঘটনায় কারা জড়িত তা দিবালোকের মতো পরিষ্কার।তিনি আরো বলেন, তিন ভাইকে মেরে দোকানপাট পুড়ে দিয়ে সেনাবাহিনীরা সম্প্রীতির কথা বলেন যা মূলত " গরু মেরে জুতা দানের" মত । তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, আমাদেরকে দিনে-দুপুরে পাখির মত গুলি করে কীভাবে শান্তি স্থাপন হবে? জায়গা জমি দখল করে নিয়ে কীভাবে সম্প্রীতি বজায় থাকে? আমাদেরকে নিজের বসতভিটা থেকে উচ্ছেদ করে পর্যটন রিসোর্ট নির্মাণ করে কীসের উন্নয়ন করা হচ্ছে? এমন শান্তি -সম্প্রীতি- উন্নয়ন পাহাড়িরা চায় না ।তিনি বলেন, দালালি লেজুড়বৃত্তি করে অধিকার আদায় হয় না । অতীতেও কুজেন্দ্র,দীপংকর তালুকদারের মত মন্ত্রীরা পাহাড়িদের অধিকার আদায়ের কথা বলতে পারেনি । তারা নিজেদের স্বার্থে সবকিছু বিক্রি করেছিল শাসকশ্রেণীর হাতে। তিনি যারা দালালি করছেন তাদেরকে হুশিয়ার করেন এবং সঠিক পথে ফিরে আসার আহ্বান জানান।পাহাড়ের ভয়াবহ পরিস্থিতি শাসকশ্রেণীর সৃষ্টি মন্তব্য করে তিনি বলেন, পাহাড়ের বর্তমান পরিস্থিতি পাহাড়িরা তৈরী করেনি, সেনা-শাসকশ্রেণীই তৈরি করেছে। তাই এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের পথও শাসকশ্রেণীর কাছে।তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামের সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরিয়ে আনার আহ্বান জানান। স্মরণসভায় আগামী ১৩ অক্টোবর ২৬, পার্বত্য চট্টগ্রামে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রথম শহীদ ভরদ্বাজ মুনি'র শহীদ দিবসে কনভেনশন অনুষ্ঠান কর্মসূচি ঘোষণা দেওয়া হয়। ছাত্র-জনতা সংগ্রাম পরিষদের আআহ্বায়ক উষাতন চাকমা এ কর্মসূচীর ঘোষণা দেন এবং কনভেনশনে সকলকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করার আহ্বান জানান।স্মরণসভা শেষে সাংস্কৃতিক স্কোয়াডের একটি প্রতিবাদী নাট্যকলা প্রদর্শনের মাধ্যমে শহীদ আক্রই-আথুই ও থৈইচিং এর শহীদ হওয়ার ঘটনাটি উপস্থাপন করা হয়। এবং শাসকশ্রেণীর দালাল সন্তু লারমা ও ধর্ষকদের কুশপুত্তলিকা লাঠিপেটা করে তা পুড়িয়ে ফেলে অগ্রণী শিশু কিশোর কেন্দ্র (এসিসি)।
কপিরাইট © ২০২৬ Daily Joypur Barta । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত