প্রকাশের তারিখ : ০৬ অক্টোবর ২০২৬
টিকে থাকার লড়াইয়ে মান্দার পাটশিল্প
পরিবেশবান্ধব পাটের ব্যাগ ও পাটজাত পণ্য তৈরি করে দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে নিজের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে আসছেন নওগাঁর মান্দা উপজেলার প্রসাদপুর ইউনিয়নের চকরাজাপুর গ্রামের উদ্যোক্তা মো. আনিসুর রহমান। একসময় তার ছোট কারখানায় কর্মচঞ্চলতা থাকলেও করোনার মহামারির ধাক্কায় সেই চিত্র এখন অনেকটাই বদলে গেছে। অর্থসংকটে বন্ধ হওয়ার পথে তার সম্ভাবনাময় পাটপণ্য তৈরির উদ্যোগ।তবে থেমে যেতে চান না এই উদ্যোক্তা। সরকারি বা প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা পেলে আবারও কারখানাটি সচল করে পাটশিল্পে নতুন করে প্রাণ ফেরানোর স্বপ্ন দেখছেন তিনি।স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, পরিবেশবান্ধব পাটের ব্যাগ ও পাটজাত পণ্যের ব্যবহার বাড়ানো গেলে একদিকে যেমন প্লাস্টিক ও পলিথিনের ব্যবহার কমবে, অন্যদিকে দেশীয় পাটশিল্পও লাভবান হবে। পাটের তৈরি পণ্য সহজে পচনশীল হওয়ায় পরিবেশের ওপর এর ক্ষতিকর প্রভাবও তুলনামূলকভাবে কম। ফলে পরিবেশ রক্ষায় পলিথিন ও প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে পাটের ব্যাগের ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।উদ্যোক্তা মো. আনিসুর রহমান জানান, প্রায় ১৫ বছর আগে অল্প পরিসরে পাটজাত পণ্য তৈরির কাজ শুরু করেন তিনি। ধীরে ধীরে কাজের পরিধি বাড়তে থাকে। করোনার আগে তার কারখানায় প্রায় ২০ জন কারিগর ও শ্রমিক নিয়মিত কাজ করতেন। উৎপাদন ও বিক্রিও চলছিল ভালোভাবে।কিন্তু করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার পর দীর্ঘ সময় কারখানা বন্ধ রাখতে হয়। এতে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন তিনি। কাজ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কারিগরদের অনেকেই জীবিকার তাগিদে অন্য পেশায় চলে যান। এরপর আর আগের অবস্থায় ফিরতে পারেনি কারখানাটি।বর্তমানে তার কারখানায় দুটি তাঁত ও দুটি সেলাই মেশিন রয়েছে। প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি থাকলেও পর্যাপ্ত মূলধন না থাকায় বড় পরিসরে উৎপাদন চালু করতে পারছেন না তিনি। ফলে বাধ্য হয়ে নিজেই যতটুকু সম্ভব পাটের ব্যাগ ও বিভিন্ন পাটজাত পণ্য তৈরি করছেন।আনিসুর রহমান বলেন, “করোনার আগে আমার কারখানায় প্রায় ২০ জন শ্রমিক কাজ করতেন। এখন মূলধনের অভাবে বড় পরিসরে কাজ করতে পারছি না। সরকারিভাবে বা কোনো ব্যাংক থেকে সহজ শর্তে ঋণ কিংবা আর্থিক সহায়তা পেলে আবারও কারখানাটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করতে চাই। এতে নিজের পাশাপাশি অনেক মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।”তিনি আরও বলেন, “পাট আমাদের দেশের ঐতিহ্য। পরিবেশ রক্ষার জন্যও পাটের তৈরি পণ্যের ব্যবহার বাড়ানো দরকার। আমি দীর্ঘদিন ধরে এই কাজ করছি। একটু সহযোগিতা পেলে আবারও নতুনভাবে শুরু করতে পারব।”বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে মান্দা উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মোসা. আতিয়া খাতুন বলেন, “পাট অত্যন্ত সম্ভাবনাময় একটি অর্থকরী শিল্প। সঠিকভাবে এ খাতকে এগিয়ে নিতে পারলে জাতীয় অর্থনীতিতে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।”তিনি আরও বলেন, “মান্দা উপজেলায় আনিসুর রহমানের মতো নিবেদিতপ্রাণ উদ্যোক্তা রয়েছেন—এটি অত্যন্ত প্রশংসনীয়। আমরা অতি শিগগিরই তার সঙ্গে সরাসরি কথা বলব এবং বন্ধপ্রায় কারখানাটি পুনরায় সচল করতে প্রয়োজনীয় সরকারি সহযোগিতার বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হবে।”সংশ্লিষ্টদের মতে, পাটজাত পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ, সহজ শর্তে ঋণ, প্রশিক্ষণ ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে আনিসুর রহমানের মতো ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারেন। এতে একদিকে যেমন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, অন্যদিকে পরিবেশবান্ধব পাটপণ্যের ব্যবহার বাড়িয়ে কমানো সম্ভব হবে পলিথিন ও প্লাস্টিকের ক্ষতিকর প্রভাব।চকরাজাপুর গ্রামের এই উদ্যোক্তার স্বপ্ন এখন একটাই—সরকারি সহায়তা পেয়ে আবারও তার কারখানায় ফিরবে কর্মচাঞ্চল্য, ফিরে আসবে হারিয়ে যাওয়া শ্রমিকদের কর্মসংস্থান। আর সেই সঙ্গে স্থানীয়ভাবে পাটশিল্পে জেগে উঠবে নতুন সম্ভাবনা।
কপিরাইট © ২০২৬ Daily Joypur Barta । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত