প্রকাশের তারিখ : ১১ অক্টোবর ২০২৬
বাঘায় পদ্মা পাড়ে তিন দিনের নৌকা বাইচ উৎসব শেষ নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন
হাজার বছরের লোকজ ঐতিহ্যকে জাগিয়ে রাখতে রাজশাহীর বাঘায় পদ্মা পাড়ে হাজারো মানুষের সমাগমে শেষ হলো তিন দিনব্যাপী ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ উৎসব ও গ্রামীণ মেলা। শনিবার পুরস্কার বিতরণের মধ্য দিয়ে উৎসবের সমাপ্তি ঘটে।উপজেলার গড়গড়ি ইউনিয়নের বেঙ্গাড়ী বাজার সংলগ্ন পদ্মা নদীতে এই বাইচের আয়োজন করা হয়। আয়োজক কমিটি জানায়, এবারের প্রতিযোগিতায় অর্ধশতাধিক নৌকা দল অংশ নেয়। প্রতিযোগীদের উৎসাহিত করতে রাখা হয়েছিল এক লাখ টাকার প্রাইজমানি।গত বৃহস্পতিবার উৎসবের উদ্বোধন করেন রাজশাহী জেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক এস এম সালাউদ্দিন আহমেদ শামীম সরকার।সমাপনী দিনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রাজশাহী-৬ (চারঘাট-বাঘা)আসনের সংসদ সদস্য আবু সাইদ চাঁদ। তিনি বলেন, সবার সহযোগিতায় হাজার বছরের লোকজ ঐতিহ্য সফলভাবে শেষ হয়েছে। এই ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। আমার কাছ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা পাবেন।দুপুর গড়াতেই পদ্মার দুই পাড়ে ভিড় জমান নারী-পুরুষ। কেউ পাড়ে দাঁড়িয়ে, কেউ নৌকায় করে নদীর ভেতর থেকে উপভোগ করেন বাইচ। কাঁসর-ঢোলের তালে তালে ‘নাও ছাড়িয়া দে, পাল উড়াইয়া দে’ গানের সুরে বৈঠা হাতে জল তরঙ্গে ছোটেন মাঝি-মাল্লারা। ৭০ হাত ৭৫ হাত নৌকা নিয়ে প্রতিযোগিতায় নামেন সিরাজগঞ্জ থেকে আসা বাংলার বাঘ ও জনতা এক্সপ্রেস। নাটোরের লালপুর উপজেলার দুড়দুড়িয়া ইউনিয়নের হুমায়ুন কবির ও হাফিজুর রহমান প্রতিযোগিতার জন্য নৌকা দুটি ভাড়ায় নিয়ে আসেন।ঐতিহ্যের পাশে মিলনমেলা:নৌকা বাইচকে কেন্দ্র করে বাঘা, চারঘাট, লালপুরসহ আশপাশের এলাকায় শুরু হয় উৎসবের আমেজ। নদী সংলগ্ন এলাকায় বসে বিশাল গ্রামীণ মেলা। মৃৎশিল্প, কাঁসা-পিতল, গৃহস্থালি সামগ্রী, শিশুদের খেলনা ও মুখরোচক মিষ্টির পসরায় জমজমাট ছিল মেলা প্রাঙ্গণ। বিনোদনের জন্য ছিল রাইডস ছাড়া ও সার্কাস।নৌকা বাইচ দেখতে কলেজ পড়–য়া মেয়েকে নিয়ে আসা রামচন্দ্রপুর গ্রামের মুনসুর রহমান বলেন, "গ্রামবাংলার হারিয়ে যেতে বসা সংস্কৃতিকে জাগাতে হলে নদীকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। নদী মরে যাওয়ায় অনেক সংস্কৃতি আজ হুমকির মুখে।"খায়েরহাট গ্রামের ৬৫ বছর বয়সী আব্দুল লতিফ মন্ডল বলেন, "২০২৩ সালের পর তিন বছর বিরতির পর আবার মেলা হচ্ছে। নৌকা বাইচ দেখতে বাড়িতে মেয়ে-জামাইসহ আত্মীয়রা এসেছে। এটা এখন আমাদের গ্রামে মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে।"আয়োজক কমিটির সভাপতি তোজাম্মেল হক বলেন, "আমাদের মূল লক্ষ্য নতুন প্রজন্মের কাছে বাংলার শিকড়ের সংস্কৃতিকে জীবন্ত রাখা। সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণে এটি ঐতিহাসিক জনসমাগমে রূপ নিয়েছে।"সাধারণ সম্পাদক আবুল কালাম ডাবলু সরকার জানান, সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন বিএনপি নেতা মাসুদ করিম টিপু, জাহিদুল ইসলাম স্বপন ও ইউনিয়ন যুবদলের সাধারণ সম্পাদক মাহবুব আলম জনিসহ এলাকার সুধীজন।নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা, ছোট্ট উদ্যোগে বড় সমাধানের পরামর্শ:তবে বড় এই আয়োজনে দুর্ঘটনা এড়াতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সরেজমিনে দেখা গেছে,প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া নৌকা সহ বিনোদনকারিদের নৌকার সঙ্গে নৌকার সংঘর্ষ কিংবা তীব্র ঢেউয়ে নৌকা ডুবে যাওয়ার শঙ্কা থাকলেও দুর্ঘটনা এড়াতে কোনো নৌকাতেই বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল না।এ প্রসঙ্গে সচেতন মহলের অভিজ্ঞদের পরামর্শ, নৌকা বাইচ শুধু প্রতিযোগিতা নয়, এটি আবেগের অংশ। তাই আনন্দের পাশাপাশি নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। প্রতিটি নৌকার সঙ্গে একটি লম্বা, মজবুত রশি এবং কয়েকটি খালি বোতল বা ভাসমান ড্রাম বেঁধে দেওয়া যেতে পারে। নৌকা ডুবে গেলেও রশির মাথায় থাকা বোতল পানির ওপরে ভেসে থাকবে। ফলে ডুবে যাওয়া নৌকার অবস্থান সহজেই চিহ্নিত করে দ্রুত উদ্ধার করা সম্ভব হবে। ছোট্ট এই উদ্যোগ বড় দুর্ঘটনা এড়াতে সহায়ক হতে পারে।বাঘা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সেরাজুল হক জানান, উৎসবমুখর পরিবেশে মেলা ও প্রতিযোগিতা সম্পন্ন করতে পুরো মেলা প্রাঙ্গণ ও আশপাশের এলাকায় পুলিশ ও গ্রাম পুলিশের সমন্বয়ে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল।##
কপিরাইট © ২০২৬ Daily Joypur Barta । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত