প্রকাশের তারিখ : ১১ অক্টোবর ২০২৬
কত সন্ধ্যা গেছে জল ছল ছল চোখে রাস্তায় হেটেছি”
২০০৮ সালের নভেম্বর মাস। নোকিয়া-সিমেন্স ছেড়ে সড়কে জয়েন করি। অধিকাংশ সহকর্মীর পোস্টিং ঢাকায় হলেও আমাকে পাঠিয়ে দেয়া হল মেন্টাল হাসপাতালের শহরে। ডিসেম্বরের শুরুতে গিয়ে হাজির হলাম পাবনায়। লাইব্রেরি বাজার মোড়ের পাশে সড়ক বিভাগের অফিস। শুরু হল নতুন অধ্যায়।প্রায় ১ যুগ কাটলো রাজধানীর হাউকাউ এর মধ্যে। আমি খাস গাঁয়ের ছেলে, জেলা শহর আমার জন্য অনেক কিছু। গনপূর্তের মাসুদ ভাইয়ের সাথে পরিচয় হয়, মাঝে মাঝে আড্ডা দিই। স্কুলবন্ধু খোকন মাঝে মাঝে আসে। কেউ না থাকলে সন্ধ্যা হলে বের হয়ে শহরে হাটি। শহরের বুক চিরে চলে যাওয়া ইছামতি দখলে দূষণে ময়লা কচুরিপানায় মৃতপ্রায়। নতুন করে খনন কাজ চলছে। শীত বেশ জেঁকে বসেছে। হাঁটতে হাঁটতে টাউন হলের দিকে যাই। প্রায় দিন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়। ছোট ছোট ছেলে মেয়েরা কী দারুণ গান গায়। দেশাত্ববোধক, ফোক, লালন। মনমুগ্ধ হয়ে শুনি। দিন দশেক গেছে। আমার কাছে কিছু ফাইল আসে, সাথে চিঠি পত্র। সরকারি চিঠির উপর একেক জন কী সব লিখে। ভীষণ আজব লাগে। মনে হয় চিঠি পেলে এঁরা কাটাকুটি খেলে। সামান্য পত্র সম্পর্কে আমার জ্ঞান এই পর্যায়ে। সেই আমাকে বস ডেকে বলে, টেন্ডার ইভালুয়েশন করো। তখন টেন্ডারের নামই শুনিনি, ইভ্যালুয়েশন করবো কিভাবে। হুটহাট বলে, এই ছেলে ১৩ নম্বর ফাইলটা বের করো। ভল্টের মত আলমারির চাবি দুইজনের কাছে থাকে। খুলে হাতাই, অন্ধের হাতি দর্শনের মত। বস মেজাজ কন্ট্রোল করতে পারেন না। ব এ আকার ল, ছ এ আকার ল সহ রকমারি ভাষায় আমাকে সম্ভাষণ করেন। এসব অপদার্থ কোথা থেকে জুটেছে ভেবে আক্ষেপের শেষ থাকে না। আমি মাটির উপর দাঁড়িয়ে থেকেও আকাশ থেকে পড়তে থাকি। শুনছিলাম এই চাকরি খুব ভালো। কিন্তু একি দেখছি। এক সিনিয়র সহকর্মীর সাথে শেয়ার করি। উনি নিজেও সেই একই বাঘের আঁচড়ে মর্মাহত। আমাকে কিছু বললে আমিও কড়া করে জবাব দেয়া শুরু করলাম। মর্মাহত সহকর্মীর পরামর্শে। বস, কিছুটা থমকে গেলেন। এরপর আবার ছুতা খুঁজে আগের চেয়ে দ্বিগুণ তিনগুন বেগে আক্রমণ শুরু করেন। নোকিয়া-সিমেন্সের স্বর্গ ছেড়ে নরক বাস শুরু হয়েছে। জীবনে কেউ এরকম খারাপ আচরণ করেছে, মনে করতে পারি না। অফিসের স্টাফরা এসে সান্ত্বনা দেন। সকাল বিকাল উনারা আমার চেয়েও বেশি খান। এক এস্টিমেটর চাকরি জীবন প্রায় শেষ। তাঁকে অবিশ্বাস্য রকম বাজে গালিগালাজ করেন। আমি ভাষা হারিয়ে ফেলি। সন্ধ্যা হলে পথে পথে হাটি, মরা ইছামতি পেরিয়ে টাউন হলের দিকে যাই। কী সুন্দর ফোক গান হচ্ছে। পাশে ভাপা, চিতই পিঠা বিক্রি হচ্ছে। কিছুই ভালো লাগে না। বের হয়ে অন্য একটা রাস্তা ধরে হাটি। অজান্তে চোখ ফেটে জল চলে আসে। অন্ধকার গলি দেখে ঢুকি, চুপিসারে চোখের জল মুছি। নিজেকে বকাও দিই। ধ্যাত, গালি খেয়ে কাঁদতে হবে! চিন্তা করি, এখানে আর না। যেকোন উপায়ে পাবনা ছাড়তে হবে। প্রায় সপ্তাহে এক দুই দিন ছুটি নিই। ঢাকা সড়ক ভবনে গিয়ে স্যারদের অনুরোধ করি। প্লিজ পাবনা থেকে সরিয়ে দেন। মাত্রই চাকরিতে ঢুকেছি। আও ভাও কিছুই বুঝি না। তবু এক জনের কাছ থেকে আরেকজনের কাছে যাই। অনেকেই আশ্বাস দেন, বিষয়টা দেখছেন। পাবনায় ফিরে আসি। বস ডাকছে শুনলেই ট্রমাটাইজ হয়ে যাই। খোদার কাছে নালিশ দিই। এ কোথায় এনে ফেললে! এর মধ্যে এক সিনিয়র সহকর্মী পদোন্নতি পাওয়ায় এসডিই পোস্ট খালি হয়েছে। বস ডেকে বলেন, তুমি চার্জ নাও। আমি প্রমাদ গুনি। বস রাজশাহী গেছে শুনে উপর তলায় এসই স্যারের কাছে গিয়ে বলি, আমি চার্জ নিবো না। তাহলে লিখিত দাও। সেই মোতাবেক চিঠি লিখে জমা দিয়ে আসি। বস ফিরে এসে ঘটনা জানতে পারেন। চোখ মুখ লাল করে বসে থাকেন। আমার ভালো করতে চেয়েও পাড়লেন না। আমার মত গর্ধভ হয় না। আমি একটা অর্ডারের অপেক্ষায় আছি। হয় হচ্ছে করে হয় না। একেকটা দিন আসে আর শেষ হতেই চায় না। এক সময় বসের মেজাজ ভালো থাকলে ডাকেন। সে কি হাসি, তামাশা।তাল দিয়ে কিছুটা হাসতেও হয়। এই রূপ দেখে বিশ্বাস হতে চায় না, লোকটার অন্য একটা চেহারা আছে। অবশেষে একদিন আমার ভাগ্যের শিকে ছিঁড়ে। ঢাকায় বদলি আদেশ জারি হয়। কাকতালীয় ভাবে রাজশাহী জোনের বড় স্যার আসেন। শুনে আমাকে হালকা বকে দেন। নতুন চাকরি, ফিল্ডে কাজ না শিখে কেন ঢাকায় যাচ্ছি। এরপর দেখি তিনি বসকে ইচ্ছেমত বকা দিচ্ছেন। তাঁর সাথে কেউ চাকরি করতে চায় না। শুনে প্রাণটায় শান্তি শান্তি লাগে। খোদাকে ধন্যবাদ দিই। সামান্য ব্যাগ বোচকা, লোটা কম্বল নিয়ে ঢাকা চলে যাই। মাঝে ২০২০ সালের এক সন্ধ্যায় মিনিট বিশেকের জন্য ঢু মেরেছিলাম। সেই অর্থে ২০০৯ এর এপ্রিলের পর পাবনা অফিসে যাওয়া হয়নি। গত ৭ অক্টোবর সকালে সেই চত্বরে উপস্থিত হই। প্রায় ১৮ বছর বাদে। নতুন ভবন হয়েছে।সেই অফিস ব্যস্ততায় গমগম করছে। পাশে আগের প্রায় পরিত্যক্ত অফিসটা অশীতিপর বৃদ্ধের মত কোনমতে দাঁড়িয়ে আছে। সময় কত কিছুর পরিবর্তন ঘটিয়ে দেয়। লেখক-মো: সাজিদ রহমানকর্মকর্তা, সড়ক বিভাগ, ঢাকা।
কপিরাইট © ২০২৬ Daily Joypur Barta । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত