প্রকাশের তারিখ : ২২ অক্টোবর ২০২৬
প্রসাদপুর খেয়াঘাটে অশ্রুসজল চোখে মা দুর্গাকে বিদায়
ঢাকের কাঠিতে আজ আর নেই উৎসবের সেই চেনা উচ্ছ্বাস। আনন্দের বাদ্য যেন রূপ নিয়েছে বিদায়ের করুণ সুরে। শঙ্খধ্বনি, উলুধ্বনি আর ভক্তদের জয়ধ্বনিতে মুখরিত চারপাশ। এরই মধ্যে অশ্রুসজল চোখে দেবী দুর্গাকে বিদায় জানিয়েছেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা।শারদীয় দুর্গোৎসবের শেষ দিন শুভ বিজয়া দশমীতে নওগাঁর মান্দা উপজেলার প্রসাদপুর খেয়াঘাটে সৃষ্টি হয় এক আবেগঘন পরিবেশ। প্রতিমা বিসর্জনকে কেন্দ্র করে নদীর ঘাটে নামে মানুষের ঢল। ঢাকের বাদ্য, শঙ্খধ্বনি ও উলুধ্বনির সঙ্গে ভক্তদের ‘জয় মা দুর্গা’ ও ‘বল দুর্গা মাই কি জয়’ ধ্বনিতে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।সকাল থেকেই উপজেলার বিভিন্ন পূজামণ্ডপে শুরু হয় বিজয়া দশমীর আনুষ্ঠানিকতা। দেবীর চরণে শেষ অঞ্জলি, বিশেষ প্রার্থনা এবং নানা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান শেষে শুরু হয় প্রতিমা বিসর্জনের প্রস্তুতি। পরে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা নিয়ে ঢাকের বাদ্যের তালে তালে একে একে প্রতিমা নিয়ে ভক্তরা সমবেত হন প্রসাদপুর খেয়াঘাটে।কেউ এসেছেন দেবী দুর্গাকে শেষবারের মতো প্রণাম জানাতে, কেউ এসেছেন বিসর্জনের দৃশ্য দেখতে। আবার অনেকেই পরিবারের সদস্যদের নিয়ে অংশ নেন এই ঐতিহ্যবাহী আয়োজনে। সব মিলিয়ে প্রসাদপুর খেয়াঘাট পরিণত হয় ধর্মীয় আবেগ, উৎসব ও সম্প্রীতির এক মিলনমেলায়।প্রতিমা বিসর্জনের মুহূর্তে অনেক ভক্তের চোখেই দেখা যায় অশ্রু। যে দেবীকে ঘিরে কয়েক দিন ধরে চলেছে পূজা-অর্চনা, আনন্দ ও উৎসবের আয়োজন, সেই দেবীকে বিদায় জানানোর মুহূর্তে আনন্দের জায়গা দখল করে নেয় এক অন্যরকম বিষাদ। তবে ভক্তদের বিশ্বাস—এই বিদায় চিরবিদায় নয়; আগামী শরতে আবারও মর্ত্যে ফিরে আসবেন মা দুর্গা।প্রতিমা বিসর্জনকে কেন্দ্র করে যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে প্রসাদপুর খেয়াঘাট এলাকায় নেওয়া হয় বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা। শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খল পরিবেশে বিসর্জন কার্যক্রম সম্পন্ন করতে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করেন।দেবী বিসর্জনের সময় উপস্থিত ছিলেন মান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোসাঃ আতিয়া খাতুন, নওগাঁর মান্দা সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ শাওন, মান্দা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) নাবিল নওরোজ বৈশাখ এবং মান্দা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোঃ আফজাল হোসেন।এছাড়াও বিসর্জনস্থলে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সদস্যরা। নদীতে প্রতিমা বিসর্জনের সময় যেকোনো ধরনের দুর্ঘটনা বা দুর্যোগ মোকাবিলায় তারা প্রস্তুত ছিলেন এবং প্রয়োজনীয় উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনার জন্য দায়িত্ব পালন করেন।প্রশাসন, পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের সমন্বিত নিরাপত্তাব্যবস্থার কারণে উৎসবমুখর পরিবেশে নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হয় প্রতিমা বিসর্জন কার্যক্রম।প্রতিমা বিসর্জনের পাশাপাশি প্রসাদপুর খেয়াঘাট এলাকায় চলে শুভ বিজয়ার শুভেচ্ছা বিনিময়, কোলাকুলি ও মিষ্টিমুখ। বিদায়ের বেদনার মাঝেও একে অপরের প্রতি ভালোবাসা, সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির বন্ধন আরও দৃঢ় করেন ভক্তরা।সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে দুর্গাপূজা শুধু ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি বাঙালির ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, ভালোবাসা ও সম্প্রীতির এক অনন্য উৎসব। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের অংশগ্রহণ এ উৎসবকে দিয়েছে সর্বজনীনতার বিশেষ মাত্রা।বিকেলের আলো ধীরে ধীরে ফুরিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে নদীর জলে বিলীন হতে থাকে একের পর এক দেবী দুর্গার প্রতিমা। ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে আসে ঢাকের বাদ্য, কমতে থাকে মানুষের কোলাহল। কিন্তু ভক্তদের হৃদয়ে তখনো বাজতে থাকে বিদায়ের সুর।প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় এবারের শারদীয় দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিকতা। তবে শেষ হয় না ভক্তদের ভালোবাসা, বিশ্বাস কিংবা অপেক্ষা। অশুভ শক্তির বিনাশ ও শুভ শক্তির বিজয়ের বার্তা নিয়ে আগামী শরতে আবারও মা দুর্গার আগমনের প্রত্যাশায় বুক বাঁধেন ভক্তরা।বিদায়ের শেষ মুহূর্তে প্রসাদপুর খেয়াঘাটের আকাশ-বাতাসে যেন ধ্বনিত হয় একটাই আকুতি—‘আসছে বছর আবার হবে, মা তুমি আবার এসো।’মা দুর্গার বিদায়ের সঙ্গে শেষ হলো এবারের উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা। কিন্তু মানুষের হৃদয়ে রয়ে গেল ভক্তির আবেগ, সম্প্রীতির বন্ধন এবং আগামী বছরের নতুন আগমনের প্রতীক্ষা।
কপিরাইট © ২০২৬ Daily Joypur Barta । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত