প্রকাশের তারিখ : ২৫ অক্টোবর ২০২৬
দেশে গিরা,পেশি ও হাড়ের বিভিন্ন সমস্যায় ভুগছেন প্রায় চার কোটি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ
দেশে গিরা, পেশি ও হাড়ের বিভিন্ন সমস্যায় ভুগছেন প্রায় চার কোটি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ। তাঁদের একটি বড় অংশ শারীরিক প্রতিবন্ধকতার শিকার হচ্ছেন। প্রতি চারজনের প্রায় একজন বছরের কোনো না কোনো সময়ে কাজ করার সক্ষমতা হারাচ্ছেন। দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার ব্যয় ও আয় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনেক পরিবার পড়ছে আর্থিক সংকটে।বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাতরোগ সরাসরি মৃত্যুর প্রধান কারণ না হলেও দীর্ঘ মেয়াদে মানুষের চলাফেরা, কর্মক্ষমতা ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে ব্যাহত করে। সময়মতো রোগ শনাক্ত ও যথাযথ চিকিৎসা না পেলে অনেকের ক্ষেত্রে স্থায়ী শারীরিক অক্ষমতাও দেখা দিতে পারে। অথচ অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে জাতীয় নীতিমালায় দীর্ঘমেয়াদি অক্ষমতার অন্যতম কারণ এই রোগ যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি।আজ ১২ অক্টোবর বিশ্ব আর্থ্রাইটিস দিবস। বাতরোগ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও দিবসটি পালিত হচ্ছে। এবারের প্রতিপাদ্য ‘আপনার স্বপ্ন পূরণ করুন’।আর্থ্রাইটিস বা বাতরোগ বলতে অস্থিসন্ধির প্রদাহজনিত বিভিন্ন রোগকে বোঝায়। এসব রোগে গিরায় ব্যথা, ফোলা ও শক্ত ভাব দেখা দিতে পারে। ফলে স্বাভাবিক চলাফেরা থেকে শুরু করে দৈনন্দিন কাজকর্মও কঠিন হয়ে পড়ে।দেশে চার কোটি প্রাপ্তবয়স্ক আক্রান্ত‘কমিউনিটি ওরিয়েন্টেড প্রোগ্রাম ফর কন্ট্রোল অব রিউমেটিক ডিজিজেস’ (কপকর্ড) পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, দেশের প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ গিরা, পেশি ও হাড়ের সমস্যায় ভুগছেন।এম এইচ শমরিতা মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. নীরা ফেরদৌস জানান, দেশে রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা প্রায় ১৭ লাখ ৫০ হাজার। প্রতিবছর নতুন করে এ রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন আরও প্রায় ছয় হাজার ৫০০ জন।বয়সজনিত হাঁটুর বাত বা অস্টিওআর্থ্রাইটিসে ভুগছেন প্রায় সোয়া কোটি মানুষ। প্রতিবছর নতুন করে অন্তত ১৩ লাখ মানুষ এ রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। অন্যদিকে, বয়সজনিত কোমরের সমস্যা লাম্বার স্পন্ডাইলোসিসে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা প্রায় এক কোটি ছয় লাখ। প্রতিবছর নতুন করে এ রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন প্রায় তিন লাখ মানুষ।ডা. নীরা ফেরদৌস বলেন, বাতজনিত সমস্যায় আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বাড়লেও সে তুলনায় দক্ষ বাতরোগ বিশেষজ্ঞের সংখ্যা কম। এ কারণে অনেক রোগী অপচিকিৎসার শিকার হচ্ছেন। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।চিকিৎসায় বছরে লাখ টাকা ব্যয়বাতরোগের চিকিৎসা ব্যয় অনেক পরিবারের জন্য বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি রাজধানীতে অনুষ্ঠিত দশম রোগী শিক্ষা কার্যক্রম ও প্রথম বৈজ্ঞানিক সম্মেলনে অংশ নেওয়া পাঁচ শতাধিক রোগীর অভিজ্ঞতায় উঠে আসে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ও কর্মক্ষমতা হারানোর কারণে সৃষ্ট আর্থিক সংকটের চিত্র। চিকিৎসা ও ওষুধের খরচ মেটানোর পাশাপাশি আয় কমে যাওয়ায় অনেক পরিবারকে সঞ্চয় ভাঙতে হচ্ছে, করতে হচ্ছে ধারদেনা।অধ্যাপক নজরুল রিউমাটোলজি ফাউন্ডেশন অ্যান্ড রিসার্চ (পিএনআরএফআর) ট্রাস্ট আয়োজিত সম্মেলনে অধ্যাপক ডা. মো. নজরুল ইসলাম জানান, রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসের চিকিৎসায় বছরে ৪০ হাজার থেকে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় হতে পারে। স্পন্ডাইলো আর্থ্রাইটিসের চিকিৎসায় খরচ হতে পারে ৪০ হাজার থেকে ছয় লাখ টাকা।এ ছাড়া হাঁটু প্রতিস্থাপনে দেড় লাখ থেকে চার লাখ টাকা এবং হিপ ফ্র্যাকচারের অস্ত্রোপচারে এক লাখ ৮০ হাজার থেকে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় হতে পারে।২০১৫ সালের জাতীয় পর্যায়ের মাসকুলোস্কেলিটাল (এমএসকে) গবেষণায় দেখা যায়, দেশের প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ৩০ দশমিক ৪ শতাংশ বাতরোগে আক্রান্ত। তাঁদের মধ্যে ২৪ দশমিক ৮ শতাংশ শারীরিক প্রতিবন্ধকতার শিকার এবং ২৪ দশমিক ৪ শতাংশ বছরের কোনো না কোনো সময়ে কাজ করার সক্ষমতা হারান।সময়মতো চিকিৎসা না পেলে স্থায়ী অক্ষমতাবিশেষজ্ঞদের মতে, বাতরোগ সম্পর্কে অসচেতনতা, চিকিৎসার ব্যয় বহনে অক্ষমতা, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের স্বল্পতা এবং সুসংগঠিত স্বাস্থ্যসেবার অভাব এ রোগের চিকিৎসায় বড় বাধা। বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা সীমিত হওয়ায় অনেক রোগীকে চিকিৎসার জন্য বড় শহরে যেতে হয়। এতে চিকিৎসার ব্যয়ের পাশাপাশি যাতায়াত ও থাকা-খাওয়ার খরচও বাড়ে।অধ্যাপক ডা. মো. নজরুল ইসলাম বলেন, সময়মতো রোগ শনাক্ত ও উপযুক্ত চিকিৎসা না পাওয়ায় অনেক বাতরোগী স্থায়ী শারীরিক অক্ষমতার শিকার হচ্ছেন। এতে তাঁদের কর্মক্ষমতা কমে যাওয়ার পাশাপাশি পরিবারের ওপরও আর্থিক চাপ বাড়ছে।দীর্ঘদিন ব্যথা সহ্য করে থাকা কিংবা চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ সেবনও ঝুঁকিপূর্ণ। সব ধরনের গিরা বা পেশির ব্যথার কারণ এক নয়। রোগের ধরন শনাক্ত না করে শুধু ব্যথা কমানোর চেষ্টা করলে মূল রোগের চিকিৎসা বিলম্বিত হতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অস্থিসন্ধির ক্ষতি বাড়ে এবং চলাফেরার সক্ষমতা কমে যায়।বাতরোগের বোঝা কমাতে প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্ত, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংখ্যা বৃদ্ধি, সাশ্রয়ী চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং সরকারি হাসপাতালে প্রয়োজনীয় সেবা সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন চিকিৎসকেরা।তাঁদের পরামর্শ, গিরায় দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা, ফোলা কিংবা চলাফেরায় সমস্যা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। নিজে থেকে ব্যথানাশক ওষুধ সেবন কিংবা চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া চিকিৎসা বন্ধ করা উচিত নয়।বাতরোগের প্রভাব শুধু শারীরিক যন্ত্রণায় সীমাবদ্ধ নয়। এ রোগ কেড়ে নিতে পারে মানুষের উপার্জনের সক্ষমতা, বাড়িয়ে দিতে পারে পরিবারের আর্থিক দুর্ভোগ। তাই সময়মতো রোগ শনাক্ত ও সাশ্রয়ী চিকিৎসা নিশ্চিত করা না গেলে দীর্ঘ মেয়াদে এ সমস্যা বড় সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটে রূপ নিতে পারে।
কপিরাইট © ২০২৬ Daily Joypur Barta । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত