শীত এখনো পুরোপুরি আসেনি। ঘাসের ডগায় জমতে শুরু করেছে শিশির, ভোরের বাতাসে অনুভূত হচ্ছে হালকা শীতের পরশ। প্রকৃতির এই পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে গ্রামবাংলায় শুরু হয়েছে শীতের অন্যতম ঐতিহ্য খেজুরের রস সংগ্রহ ও গুড় তৈরির প্রস্তুতি।
দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ উপজেলার পল্লিতে এখন সেই চেনা দৃশ্য। ভোরের আলো ফোটার আগেই খেজুরগাছ থেকে রস নামাতে ব্যস্ত গাছিরা। কোথাও গাছের ডালে ঝুলছে মাটির হাঁড়ি, কোথাও মাটির চুলায় জ্বলছে টাটকা রস। কড়াইভর্তি রস জ্বাল দিয়ে তৈরি হচ্ছে সুস্বাদু খেজুরের গুড়, পাটালি ও লালি।
শীতের আগমনী বার্তায় নবাবগঞ্জের দাউদপুরসহ আশপাশের গ্রামগুলোতে যেন শুরু হয়েছে খেজুরের রস ও গুড় তৈরির উৎসব। আর এই উৎসবের অন্যতম কারিগর রাজশাহীর বাঘমারা থেকে আসা ছয়জন গাছি। বছরের বেশির ভাগ সময় অন্য কাজ করলেও শীত মৌসুম এলেই তাঁদের জীবিকার বড় অংশ হয়ে ওঠে খেজুরের গুড় তৈরি। জীবিকার তাগিদে পরিবার-পরিজন ছেড়ে কয়েক মাসের জন্য ছুটে আসেন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে।
ভোরের অন্ধকারেই শুরু কর্মযজ্ঞ সরেজমিনে উপজেলার দাউদপুর এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, রাস্তার দুই পাশে সারি সারি খেজুরগাছ। প্রতিটি গাছের সঙ্গে ঝুলছে মাটির তৈরি হাঁড়ি। রাতভর গাছের কাটা অংশ দিয়ে চুইয়ে পড়া রসে ভরে উঠেছে হাঁড়িগুলো। ভোরের আলো ফোটার আগেই গাছিরা একে একে গাছ থেকে হাঁড়ি নামিয়ে রস সংগ্রহ করছেন। এরপর সেই রস বড় পাত্রে ঢেলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে গুড় তৈরির চুলায়।
মাটির তৈরি বিশাল চুলায় বসানো হয়েছে বড় বড় টিনের কড়াই। একদিকে জ্বালানি কাঠের আগুন, অন্যদিকে কড়াইভর্তি রস। দীর্ঘ সময় ধরে জ্বাল দেওয়ার পর ধীরে ধীরে ঘন হয়ে আসছে রস। গাছিরা অভিজ্ঞ হাতে নাড়াচাড়া করে তৈরি করছেন গুড়। রসের ঘনত্ব ঠিক হলেই তা নামিয়ে তৈরি করা হচ্ছে বিভিন্ন আকৃতির গুড় ও পাটালি। কোথাও তৈরি হচ্ছে তরল লালি।
চুলার আগুনের ধোঁয়া আর টাটকা খেজুরের গুড়ের মিষ্টি ঘ্রাণে মুখর হয়ে উঠেছে চারপাশ। কাজের ফাঁকে কেউ হাঁড়ি পরিষ্কার করছেন, কেউ গাছের পরিচর্যা করছেন, আবার কেউ তৈরি গুড় বিক্রির জন্য প্রস্তুত করছেন। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে তাঁদের এই কর্মযজ্ঞ।
২৩২টি গাছ নিয়ে ছয়জনের সংসার খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রাজশাহীর বাঘমারা উপজেলার মনোহরপুর গ্রামের ছয়জন গাছি একসঙ্গে নবাবগঞ্জে এসেছেন। তাঁরা হলেন—মো. হযরত আলী (৪৫), জাকির হোসেন (৪২), জাহিরুল হক (৩৮), রফিক উদ্দিন (৪৪), মানিক হাসান (৪৫) ও হাজির আলী (৩৮)। দীর্ঘদিন ধরে তাঁরা খেজুরের রস সংগ্রহ ও গুড় তৈরির কাজ করে আসছেন।
গত চার বছর ধরে শীত মৌসুমে নবাবগঞ্জ উপজেলার দাউদপুর এলাকায় এসে তাঁরা এই কাজ করছেন। প্রতিবছর স্থানীয় গাছমালিকদের কাছ থেকে চুক্তিতে খেজুরগাছ নিয়ে রস সংগ্রহ করেন। এ বছর তাঁদের অধীনে রয়েছে ২৩২টি খেজুরগাছ।
গাছি হযরত আলী জানান, আশ্বিন মাসের ২২ তারিখে তাঁরা নবাবগঞ্জে এসেছেন। কার্তিক মাস থেকেই শুরু করেছেন গুড় তৈরির কাজ। বাপ-দাদার কাছ থেকে এই পেশার হাতেখড়ি। বছরের প্রায় পাঁচ মাস দেশের বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে খেজুরের রস সংগ্রহ ও গুড় তৈরি করেন। বাকি সময় নিজ এলাকায় কৃষিকাজ ও ছোটখাটো ব্যবসা করে জীবিকা নির্বাহ করেন।
তিনি বলেন, ‘বাপ-দাদার কাছ থেকেই এই কাজ শিখেছি। শীত এলেই দেশের বিভিন্ন এলাকায় চলে যাই। স্থানীয় গাছমালিকদের কাছ থেকে চুক্তিতে খেজুরগাছ নিয়ে রস সংগ্রহ করি। সেই রস জ্বাল দিয়ে গুড় তৈরি করে বাজারে বিক্রি করি। খেজুরের গুড় তৈরি করাই আমাদের মূল মৌসুমি ব্যবসা।’
গাছপ্রতি রস ২ থেকে ৪ কেজি, বাড়ছে গুড়ের উৎপাদন গাছি হযরত আলীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মৌসুমের শুরুতে প্রতিটি গাছ থেকে প্রতিদিন দুই থেকে আড়াই কেজি করে রস পাওয়া যাচ্ছে। শীত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রসের পরিমাণও বাড়ে। তখন একটি গাছ থেকে প্রতিদিন তিন থেকে চার কেজি পর্যন্ত রস সংগ্রহ করা সম্ভব হয়।
এখন প্রতিদিন সব মিলিয়ে আনুমানিক ২৫ থেকে ৩০ কেজি গুড় তৈরি হচ্ছে। মৌসুম পুরোদমে শুরু হলে উৎপাদন বেড়ে দৈনিক এক থেকে দুই মণ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। উৎপাদিত গুড় স্থানীয় বাজারে পাইকার ও খুচরা ক্রেতাদের কাছে বিক্রি করছেন তাঁরা।
বর্তমানে প্রতি কেজি খেজুরের গুড় পাইকারি ২৩০ টাকা এবং খুচরা ২৬০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। প্রতিদিনই স্থানীয় ক্রেতাদের পাশাপাশি আশপাশের এলাকার মানুষও টাটকা গুড় কিনতে আসছেন।
শীতের পিঠাপুলিতে খেজুরের গুড়ের আলাদা কদর বাঙালির শীতকালীন খাবারের সঙ্গে খেজুরের গুড়ের সম্পর্ক বহুদিনের। শীত এলেই গ্রামবাংলার ঘরে ঘরে শুরু হয় ভাপা পিঠা, চিতই পিঠা, পাটিসাপটা, পায়েস, ক্ষীর, মুড়ি-মুড়কি ও নানা ধরনের মুখরোচক খাবার তৈরির আয়োজন। আর এসব খাবারের স্বাদ বাড়াতে খেজুরের গুড়ের বিকল্প যেন নেই।
চিনির তুলনায় খেজুরের গুড়ের দাম কিছুটা বেশি হলেও স্বাদ, ঘ্রাণ ও ঐতিহ্যের কারণে এর চাহিদা প্রতিবছরই থাকে। বিশেষ করে গাছ থেকে সদ্য সংগ্রহ করা রস দিয়ে তৈরি টাটকা গুড়ের প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহ বেশি।
গুড় কিনতে আসা স্কুলশিক্ষক মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘কার্তিক মাস থেকেই শীতের আমেজ শুরু হয়েছে। শীত মানেই পিঠা-পায়েস। আর এসব খাবারে খেজুরের গুড়ের স্বাদ ও ঘ্রাণ অতুলনীয়। এখানে গাছিদের নিজেদের হাতে রস সংগ্রহ ও গুড় তৈরি করতে দেখছি। তাই ভেজালমুক্ত ও টাটকা গুড় পাওয়ার আশায় এখান থেকে কিনতে এসেছি। গুড় তৈরি হওয়ার পর প্রতিদিনই অনেক মানুষ কিনে নিয়ে যাচ্ছেন।’
ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন ভিনজেলার গাছিরা, একসময় গ্রামবাংলার প্রায় প্রতিটি এলাকায় খেজুরের রস সংগ্রহ ও গুড় তৈরির প্রচলন ছিল। শীতের সকালে গাছির হাঁড়িভর্তি রস নিয়ে বাড়ি ফেরার দৃশ্য ছিল গ্রামীণ জীবনের পরিচিত অংশ। তবে সময়ের পরিবর্তনে অনেক এলাকায় খেজুরগাছের সংখ্যা কমেছে, কমেছে স্থানীয় গাছির সংখ্যাও। এমন পরিস্থিতিতে এক জেলা থেকে অন্য জেলায় গিয়ে খেজুরের গুড় তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করছেন হযরত আলীর মতো অনেক গাছি।
তাঁদের হাত ধরেই এখনো টিকে আছে গ্রামবাংলার এই ঐতিহ্যবাহী পেশা। একদিকে তাঁরা নিজেদের জীবিকা নির্বাহ করছেন, অন্যদিকে স্থানীয় মানুষের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন শীতের বিশেষ আকর্ষণ খেজুরের গুড়।
নবাবগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান মো. তরিকুল ইসলাম বলেন, কয়েক দিন আগে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিধান কান্তি হালদারকে সঙ্গে নিয়ে তিনি গাছিদের গুড় তৈরির কার্যক্রম পরিদর্শন করেছেন। গাছিদের তৈরি গুড় বেশ সুস্বাদু। স্থানীয় পর্যায়ে এর চাহিদাও বাড়ছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিধান কান্তি হালদার বলেন, গাছিদের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশে গুড় তৈরির জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তাঁরা সে অনুযায়ী গুড় তৈরি করছেন। খেজুরগাছ থেকে রস সংগ্রহ করে গুড় তৈরির এই কার্যক্রম গ্রামীণ ঐতিহ্যের একটি অংশ।
শীত পুরোপুরি নামার আগেই নবাবগঞ্জের পল্লিতে শুরু হয়েছে খেজুরের রস ও গুড় তৈরির মৌসুমি কর্মযজ্ঞ। মাটির চুলার আগুনে জ্বাল দেওয়া রস, গাছিদের ব্যস্ত হাত আর টাটকা গুড়ের মিষ্টি ঘ্রাণে ফিরে আসছে গ্রামবাংলার চিরচেনা শীতের আবহ। ছয়জন গাছির পরিশ্রমে ২৩২টি খেজুরগাছ থেকে তৈরি হচ্ছে শীতের মিষ্টি আয়োজন। তাঁদের হাত ধরেই নবাবগঞ্জের গ্রামীণ জনপদে নতুন করে প্রাণ ফিরে পাচ্ছে খেজুরের গুড় তৈরির ঐতিহ্য।

মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৩ নভেম্বর ২০২৬
শীত এখনো পুরোপুরি আসেনি। ঘাসের ডগায় জমতে শুরু করেছে শিশির, ভোরের বাতাসে অনুভূত হচ্ছে হালকা শীতের পরশ। প্রকৃতির এই পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে গ্রামবাংলায় শুরু হয়েছে শীতের অন্যতম ঐতিহ্য খেজুরের রস সংগ্রহ ও গুড় তৈরির প্রস্তুতি।
দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ উপজেলার পল্লিতে এখন সেই চেনা দৃশ্য। ভোরের আলো ফোটার আগেই খেজুরগাছ থেকে রস নামাতে ব্যস্ত গাছিরা। কোথাও গাছের ডালে ঝুলছে মাটির হাঁড়ি, কোথাও মাটির চুলায় জ্বলছে টাটকা রস। কড়াইভর্তি রস জ্বাল দিয়ে তৈরি হচ্ছে সুস্বাদু খেজুরের গুড়, পাটালি ও লালি।
শীতের আগমনী বার্তায় নবাবগঞ্জের দাউদপুরসহ আশপাশের গ্রামগুলোতে যেন শুরু হয়েছে খেজুরের রস ও গুড় তৈরির উৎসব। আর এই উৎসবের অন্যতম কারিগর রাজশাহীর বাঘমারা থেকে আসা ছয়জন গাছি। বছরের বেশির ভাগ সময় অন্য কাজ করলেও শীত মৌসুম এলেই তাঁদের জীবিকার বড় অংশ হয়ে ওঠে খেজুরের গুড় তৈরি। জীবিকার তাগিদে পরিবার-পরিজন ছেড়ে কয়েক মাসের জন্য ছুটে আসেন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে।
ভোরের অন্ধকারেই শুরু কর্মযজ্ঞ সরেজমিনে উপজেলার দাউদপুর এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, রাস্তার দুই পাশে সারি সারি খেজুরগাছ। প্রতিটি গাছের সঙ্গে ঝুলছে মাটির তৈরি হাঁড়ি। রাতভর গাছের কাটা অংশ দিয়ে চুইয়ে পড়া রসে ভরে উঠেছে হাঁড়িগুলো। ভোরের আলো ফোটার আগেই গাছিরা একে একে গাছ থেকে হাঁড়ি নামিয়ে রস সংগ্রহ করছেন। এরপর সেই রস বড় পাত্রে ঢেলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে গুড় তৈরির চুলায়।
মাটির তৈরি বিশাল চুলায় বসানো হয়েছে বড় বড় টিনের কড়াই। একদিকে জ্বালানি কাঠের আগুন, অন্যদিকে কড়াইভর্তি রস। দীর্ঘ সময় ধরে জ্বাল দেওয়ার পর ধীরে ধীরে ঘন হয়ে আসছে রস। গাছিরা অভিজ্ঞ হাতে নাড়াচাড়া করে তৈরি করছেন গুড়। রসের ঘনত্ব ঠিক হলেই তা নামিয়ে তৈরি করা হচ্ছে বিভিন্ন আকৃতির গুড় ও পাটালি। কোথাও তৈরি হচ্ছে তরল লালি।
চুলার আগুনের ধোঁয়া আর টাটকা খেজুরের গুড়ের মিষ্টি ঘ্রাণে মুখর হয়ে উঠেছে চারপাশ। কাজের ফাঁকে কেউ হাঁড়ি পরিষ্কার করছেন, কেউ গাছের পরিচর্যা করছেন, আবার কেউ তৈরি গুড় বিক্রির জন্য প্রস্তুত করছেন। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে তাঁদের এই কর্মযজ্ঞ।
২৩২টি গাছ নিয়ে ছয়জনের সংসার খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রাজশাহীর বাঘমারা উপজেলার মনোহরপুর গ্রামের ছয়জন গাছি একসঙ্গে নবাবগঞ্জে এসেছেন। তাঁরা হলেন—মো. হযরত আলী (৪৫), জাকির হোসেন (৪২), জাহিরুল হক (৩৮), রফিক উদ্দিন (৪৪), মানিক হাসান (৪৫) ও হাজির আলী (৩৮)। দীর্ঘদিন ধরে তাঁরা খেজুরের রস সংগ্রহ ও গুড় তৈরির কাজ করে আসছেন।
গত চার বছর ধরে শীত মৌসুমে নবাবগঞ্জ উপজেলার দাউদপুর এলাকায় এসে তাঁরা এই কাজ করছেন। প্রতিবছর স্থানীয় গাছমালিকদের কাছ থেকে চুক্তিতে খেজুরগাছ নিয়ে রস সংগ্রহ করেন। এ বছর তাঁদের অধীনে রয়েছে ২৩২টি খেজুরগাছ।
গাছি হযরত আলী জানান, আশ্বিন মাসের ২২ তারিখে তাঁরা নবাবগঞ্জে এসেছেন। কার্তিক মাস থেকেই শুরু করেছেন গুড় তৈরির কাজ। বাপ-দাদার কাছ থেকে এই পেশার হাতেখড়ি। বছরের প্রায় পাঁচ মাস দেশের বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে খেজুরের রস সংগ্রহ ও গুড় তৈরি করেন। বাকি সময় নিজ এলাকায় কৃষিকাজ ও ছোটখাটো ব্যবসা করে জীবিকা নির্বাহ করেন।
তিনি বলেন, ‘বাপ-দাদার কাছ থেকেই এই কাজ শিখেছি। শীত এলেই দেশের বিভিন্ন এলাকায় চলে যাই। স্থানীয় গাছমালিকদের কাছ থেকে চুক্তিতে খেজুরগাছ নিয়ে রস সংগ্রহ করি। সেই রস জ্বাল দিয়ে গুড় তৈরি করে বাজারে বিক্রি করি। খেজুরের গুড় তৈরি করাই আমাদের মূল মৌসুমি ব্যবসা।’
গাছপ্রতি রস ২ থেকে ৪ কেজি, বাড়ছে গুড়ের উৎপাদন গাছি হযরত আলীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মৌসুমের শুরুতে প্রতিটি গাছ থেকে প্রতিদিন দুই থেকে আড়াই কেজি করে রস পাওয়া যাচ্ছে। শীত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রসের পরিমাণও বাড়ে। তখন একটি গাছ থেকে প্রতিদিন তিন থেকে চার কেজি পর্যন্ত রস সংগ্রহ করা সম্ভব হয়।
এখন প্রতিদিন সব মিলিয়ে আনুমানিক ২৫ থেকে ৩০ কেজি গুড় তৈরি হচ্ছে। মৌসুম পুরোদমে শুরু হলে উৎপাদন বেড়ে দৈনিক এক থেকে দুই মণ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। উৎপাদিত গুড় স্থানীয় বাজারে পাইকার ও খুচরা ক্রেতাদের কাছে বিক্রি করছেন তাঁরা।
বর্তমানে প্রতি কেজি খেজুরের গুড় পাইকারি ২৩০ টাকা এবং খুচরা ২৬০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। প্রতিদিনই স্থানীয় ক্রেতাদের পাশাপাশি আশপাশের এলাকার মানুষও টাটকা গুড় কিনতে আসছেন।
শীতের পিঠাপুলিতে খেজুরের গুড়ের আলাদা কদর বাঙালির শীতকালীন খাবারের সঙ্গে খেজুরের গুড়ের সম্পর্ক বহুদিনের। শীত এলেই গ্রামবাংলার ঘরে ঘরে শুরু হয় ভাপা পিঠা, চিতই পিঠা, পাটিসাপটা, পায়েস, ক্ষীর, মুড়ি-মুড়কি ও নানা ধরনের মুখরোচক খাবার তৈরির আয়োজন। আর এসব খাবারের স্বাদ বাড়াতে খেজুরের গুড়ের বিকল্প যেন নেই।
চিনির তুলনায় খেজুরের গুড়ের দাম কিছুটা বেশি হলেও স্বাদ, ঘ্রাণ ও ঐতিহ্যের কারণে এর চাহিদা প্রতিবছরই থাকে। বিশেষ করে গাছ থেকে সদ্য সংগ্রহ করা রস দিয়ে তৈরি টাটকা গুড়ের প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহ বেশি।
গুড় কিনতে আসা স্কুলশিক্ষক মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘কার্তিক মাস থেকেই শীতের আমেজ শুরু হয়েছে। শীত মানেই পিঠা-পায়েস। আর এসব খাবারে খেজুরের গুড়ের স্বাদ ও ঘ্রাণ অতুলনীয়। এখানে গাছিদের নিজেদের হাতে রস সংগ্রহ ও গুড় তৈরি করতে দেখছি। তাই ভেজালমুক্ত ও টাটকা গুড় পাওয়ার আশায় এখান থেকে কিনতে এসেছি। গুড় তৈরি হওয়ার পর প্রতিদিনই অনেক মানুষ কিনে নিয়ে যাচ্ছেন।’
ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন ভিনজেলার গাছিরা, একসময় গ্রামবাংলার প্রায় প্রতিটি এলাকায় খেজুরের রস সংগ্রহ ও গুড় তৈরির প্রচলন ছিল। শীতের সকালে গাছির হাঁড়িভর্তি রস নিয়ে বাড়ি ফেরার দৃশ্য ছিল গ্রামীণ জীবনের পরিচিত অংশ। তবে সময়ের পরিবর্তনে অনেক এলাকায় খেজুরগাছের সংখ্যা কমেছে, কমেছে স্থানীয় গাছির সংখ্যাও। এমন পরিস্থিতিতে এক জেলা থেকে অন্য জেলায় গিয়ে খেজুরের গুড় তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করছেন হযরত আলীর মতো অনেক গাছি।
তাঁদের হাত ধরেই এখনো টিকে আছে গ্রামবাংলার এই ঐতিহ্যবাহী পেশা। একদিকে তাঁরা নিজেদের জীবিকা নির্বাহ করছেন, অন্যদিকে স্থানীয় মানুষের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন শীতের বিশেষ আকর্ষণ খেজুরের গুড়।
নবাবগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান মো. তরিকুল ইসলাম বলেন, কয়েক দিন আগে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিধান কান্তি হালদারকে সঙ্গে নিয়ে তিনি গাছিদের গুড় তৈরির কার্যক্রম পরিদর্শন করেছেন। গাছিদের তৈরি গুড় বেশ সুস্বাদু। স্থানীয় পর্যায়ে এর চাহিদাও বাড়ছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিধান কান্তি হালদার বলেন, গাছিদের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশে গুড় তৈরির জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তাঁরা সে অনুযায়ী গুড় তৈরি করছেন। খেজুরগাছ থেকে রস সংগ্রহ করে গুড় তৈরির এই কার্যক্রম গ্রামীণ ঐতিহ্যের একটি অংশ।
শীত পুরোপুরি নামার আগেই নবাবগঞ্জের পল্লিতে শুরু হয়েছে খেজুরের রস ও গুড় তৈরির মৌসুমি কর্মযজ্ঞ। মাটির চুলার আগুনে জ্বাল দেওয়া রস, গাছিদের ব্যস্ত হাত আর টাটকা গুড়ের মিষ্টি ঘ্রাণে ফিরে আসছে গ্রামবাংলার চিরচেনা শীতের আবহ। ছয়জন গাছির পরিশ্রমে ২৩২টি খেজুরগাছ থেকে তৈরি হচ্ছে শীতের মিষ্টি আয়োজন। তাঁদের হাত ধরেই নবাবগঞ্জের গ্রামীণ জনপদে নতুন করে প্রাণ ফিরে পাচ্ছে খেজুরের গুড় তৈরির ঐতিহ্য।

আপনার মতামত লিখুন