দেশে শতভাগ বিদ্যুতায়নের ঘোষণা অনেক আগেই দেওয়া হলেও বাস্তব চিত্র এখনো ভিন্ন। শহর থেকে প্রত্যন্ত গ্রাম—সবখানেই কিছু পরিবার নানা কারণে এখনও বিদ্যুৎ সুবিধা থেকে বঞ্চিত। অবকাঠামো, গ্রিড সংযোগ, আর্থিক সামর্থ্যের অভাব—এ তিনের ফাঁদে পড়ে বহু মানুষের ঘরে আজও জ্বলে না বৈদ্যুতিক বাতি। সরকারের উন্নয়ন পদক্ষেপের অগ্রগতি থাকলেও বিদ্যুৎবঞ্চিত মানুষগুলো রয়ে গেছে নানামুখী সমস্যা, অন্ধকার ও অনিশ্চয়তার জীবনে।
এরকমই দুই দরিদ্র পরিবার বহু বছর ধরে বিদ্যুৎবঞ্চিত ছিলেন, জয়পুরহাটের আক্কেলপুর পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের দুই পরিবার- দিনমজুর নুর ইসলাম ও ৭৮ বছরের বৃদ্ধ ইদ্রিস আলীর জীবন যেন সেই বাস্তবতার নির্মম উদাহরণ। দীর্ঘ দুই দশক ধরে বিদ্যুৎহীন থেকে কুপিবাতির ধোঁয়া, কষ্ট ও অভাবের সঙ্গে লড়াই করে কাটিয়েছেন তারা। বিষয়টি জানার পর মানবিক উদ্যোগে নিজস্ব অর্থায়নে তাদের ঘরে বিদ্যুৎ সংযোগ দেন স্বেচ্ছাসেবক দলের আক্কেলপুর উপজেলা সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক জহুরুল ইসলাম।
বিহারপুর নয়াপাড়ার নুর ইসলামের ঘরে প্রায় ২০ বছর ধরে কোনো বিদ্যুতের আলো জ্বলেনি। অন্যের জমিতে টিনের ছোট একটি ঝুপড়ি ঘরে বসবাস করেন তিনি। স্ত্রী, পঙ্গু ছেলে, পুত্রবধূ ও দুই নাতি—এই ছয়জনের পরিবার নিয়ে তাকে বাঁচতে হয়েছে অন্ধকারে। সন্ধ্যা নামলেই ঘর ডুবে যেত ঘুটঘুটে অন্ধকারে। আলোর জন্য জ্বালাতে হতো কেরোসিনের ল্যাম্প ও মোমবাতি তাও নিয়মিত কেনার সামর্থ্য ছিল না।
ছেলের দীর্ঘ চিকিৎসায় যা ছিল সব খরচ হয়ে যাওয়ায় বিদ্যুতের সংযোগ নেওয়া তাঁর পক্ষে ছিল অসম্ভব। জীবনযুদ্ধের প্রতিটি দিন নুর ইসলাম কাটিয়েছেন অভাব, কষ্ট ও অসহায়তার সঙ্গে লড়াই করে।
অন্যদিকে, রাজকান্দা ময়েনপাড়ার বৃদ্ধ ইদ্রিস আলীর গল্প আরও দীর্ঘ। ১৯৮৬ সালে জয়পুরহাটে পল্লী বিদ্যুতের কার্যক্রম শুরু হলেও ২৬ বছরেও তাঁর ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছেনি। গাছের খড়ি কেটে বাজারে বিক্রি করাই ছিল তার সংসারের একমাত্র আয়। দিনে খরচ মিটলেই ভাগ্য ভালো, না হলে কেরোসিন ল্যাম্পের ধোঁয়ায় নিঃশ্বাস নিতে হতো পুরো রাত।
বয়সের ভারে চোখে কম দেখেন। কুপিবাতির ধোঁয়া ও কালিতে ঘর ভরে উঠত। তবুও সংসারের অভাবের কারণে কখনো বিদ্যুৎ নেওয়ার কথা ভাবতেও পারেননি।
জানা যায়, সম্প্রতি একদিন কেরোসিনের টাকার জন্য জহুরুল ইসলামের কাছে আসেন ইদ্রিস আলী। কথা বলতে বলতে তিনি জানান, তার ঘরে কোনো বিদ্যুৎ নেই। খবরটি জহুরুল ইসলামকে নাড়া দেয়। পরে খোঁজ নিতে গিয়ে তিনি জানতে পারেন নুর ইসলামের পরিবারও দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যুৎহীন।
এই দুই পরিবারের অবস্থা সরেজমিনে দেখে তিনি সিদ্ধান্ত নেন নিজ দায়িত্বে সংযোগ করে দেওয়ার। পরে বিদ্যুৎ বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে তার নিজের অর্থায়নে প্রয়োজনীয় সব কাজ শেষে চার দিন আগে দুই পরিবারের ঘরে জ্বলে ওঠে সেই বহু প্রত্যাশিত বৈদ্যুতিক আলো।
এ ঘটনা দুই পরিবারে এনে দিয়েছে আনন্দের বন্যা।
বিদ্যুৎ পাওয়ার পর নুর ইসলামের চোখে-মুখে আনন্দ ও স্বস্তির ছাপ তিনি বলেন, পঙ্গু ছেলের চিকিৎসায় যা ছিল সব টাকাই খরচ হয়ে গেছে। একসময় মনে হতো আমাদের ভাগ্যে আর আলো জ্বলা লেখা নেই। সন্ধ্যা নামলেই ঘরটা অন্ধকারে ঢেকে যেত, নাতি–নাতনিদের মুখও ভাল করে দেখা যেত না। এতদিন ধরে মনে মনে শুধু একটা দোয়া করতাম- কবে আমাদের ঘরেও আলো জ্বলবে। জহুরুল ভাই আমাদের বিদ্যুতের সব ব্যবস্থা করে দিলেন। এখন আমাদের ঘর আলোর ঝলমল করছে।
ইদ্রিস আলীর চোখে-মুখে একই উচ্ছ্বাস তিনিও বলেন-আমার বয়স এখন অনেক। চোখেও ঠিকমতো দেখি না। এত বছর ধরে কুপিবাতির ধোঁয়া আর কালি সহ্য করে কাটাইছি। ভাবতাম দারিদ্র্যের কারণে হয়তো জীবনের বাকি সময়টুকুও এইভাবেই অন্ধকারে কাটাতে হবে। বিদ্যুতের বিল দিতে পারব না বলে এতদিন কোনোদিন সাহসই করিনি সংযোগ নেওয়ার। আমি ভাবছিলাম- এই বয়সে আর আলো দেখমু না। কিন্তু আল্লাহর রহমতের কারণে বহু বছরের সেই অন্ধকার দূর হয়ে গেল।
জহুরুল ইসলাম বলেন,“মানুষ হিসেবে তাদের অবস্থাটা আমাকে নাড়া দিয়েছে। তাই নিজ উদ্যোগে বিদ্যুৎ সংযোগের ব্যবস্থা করি। সমাজের সামর্থ্যবান মানুষ সবাই একটু এগিয়ে এলে অন্ধকারে থাকা পরিবারগুলো আলো পেতে পারে।”
পৌরসভার সাবেক মেয়র ও বিএনপি নেতা আলমগীর চৌধুরী বাদশা বলেন, “শতভাগ বিদ্যুতায়নের ঘোষণার পরও দুই পরিবার এত বছর বঞ্চিত ছিল এটা দুঃখজনক। জহুরুল ইসলামের এই মানবিক উদ্যোগ অত্যন্ত প্রশংসনীয়।”
জয়পুরহাট পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আক্কেলপুর জোনের ডিজিএম আব্দুর রহমান সরকার জানান, “খবর পাওয়ার পর নামমাত্র ফিতে সংযোগ দেওয়া হয়েছে। এলাকায় যে কেউ বিদ্যুৎ সুবিধার বাইরে থাকলে তারা যোগাযোগ করলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
বিশ বছরের অন্ধকার শেষে দুই পরিবারের ঘরে জ্বলে ওঠা বৈদ্যুতিক আলো শুধু একটি সুইচ চাপার বিষয় নয়, এটা মানবতার আলো, যা প্রমাণ করে সঠিক সময়ে একটি ছোট উদ্যোগও বদলে দিতে পারে মানুষের পুরো জীবন।

শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৮ নভেম্বর ২০২৫
দেশে শতভাগ বিদ্যুতায়নের ঘোষণা অনেক আগেই দেওয়া হলেও বাস্তব চিত্র এখনো ভিন্ন। শহর থেকে প্রত্যন্ত গ্রাম—সবখানেই কিছু পরিবার নানা কারণে এখনও বিদ্যুৎ সুবিধা থেকে বঞ্চিত। অবকাঠামো, গ্রিড সংযোগ, আর্থিক সামর্থ্যের অভাব—এ তিনের ফাঁদে পড়ে বহু মানুষের ঘরে আজও জ্বলে না বৈদ্যুতিক বাতি। সরকারের উন্নয়ন পদক্ষেপের অগ্রগতি থাকলেও বিদ্যুৎবঞ্চিত মানুষগুলো রয়ে গেছে নানামুখী সমস্যা, অন্ধকার ও অনিশ্চয়তার জীবনে।
এরকমই দুই দরিদ্র পরিবার বহু বছর ধরে বিদ্যুৎবঞ্চিত ছিলেন, জয়পুরহাটের আক্কেলপুর পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের দুই পরিবার- দিনমজুর নুর ইসলাম ও ৭৮ বছরের বৃদ্ধ ইদ্রিস আলীর জীবন যেন সেই বাস্তবতার নির্মম উদাহরণ। দীর্ঘ দুই দশক ধরে বিদ্যুৎহীন থেকে কুপিবাতির ধোঁয়া, কষ্ট ও অভাবের সঙ্গে লড়াই করে কাটিয়েছেন তারা। বিষয়টি জানার পর মানবিক উদ্যোগে নিজস্ব অর্থায়নে তাদের ঘরে বিদ্যুৎ সংযোগ দেন স্বেচ্ছাসেবক দলের আক্কেলপুর উপজেলা সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক জহুরুল ইসলাম।
বিহারপুর নয়াপাড়ার নুর ইসলামের ঘরে প্রায় ২০ বছর ধরে কোনো বিদ্যুতের আলো জ্বলেনি। অন্যের জমিতে টিনের ছোট একটি ঝুপড়ি ঘরে বসবাস করেন তিনি। স্ত্রী, পঙ্গু ছেলে, পুত্রবধূ ও দুই নাতি—এই ছয়জনের পরিবার নিয়ে তাকে বাঁচতে হয়েছে অন্ধকারে। সন্ধ্যা নামলেই ঘর ডুবে যেত ঘুটঘুটে অন্ধকারে। আলোর জন্য জ্বালাতে হতো কেরোসিনের ল্যাম্প ও মোমবাতি তাও নিয়মিত কেনার সামর্থ্য ছিল না।
ছেলের দীর্ঘ চিকিৎসায় যা ছিল সব খরচ হয়ে যাওয়ায় বিদ্যুতের সংযোগ নেওয়া তাঁর পক্ষে ছিল অসম্ভব। জীবনযুদ্ধের প্রতিটি দিন নুর ইসলাম কাটিয়েছেন অভাব, কষ্ট ও অসহায়তার সঙ্গে লড়াই করে।
অন্যদিকে, রাজকান্দা ময়েনপাড়ার বৃদ্ধ ইদ্রিস আলীর গল্প আরও দীর্ঘ। ১৯৮৬ সালে জয়পুরহাটে পল্লী বিদ্যুতের কার্যক্রম শুরু হলেও ২৬ বছরেও তাঁর ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছেনি। গাছের খড়ি কেটে বাজারে বিক্রি করাই ছিল তার সংসারের একমাত্র আয়। দিনে খরচ মিটলেই ভাগ্য ভালো, না হলে কেরোসিন ল্যাম্পের ধোঁয়ায় নিঃশ্বাস নিতে হতো পুরো রাত।
বয়সের ভারে চোখে কম দেখেন। কুপিবাতির ধোঁয়া ও কালিতে ঘর ভরে উঠত। তবুও সংসারের অভাবের কারণে কখনো বিদ্যুৎ নেওয়ার কথা ভাবতেও পারেননি।
জানা যায়, সম্প্রতি একদিন কেরোসিনের টাকার জন্য জহুরুল ইসলামের কাছে আসেন ইদ্রিস আলী। কথা বলতে বলতে তিনি জানান, তার ঘরে কোনো বিদ্যুৎ নেই। খবরটি জহুরুল ইসলামকে নাড়া দেয়। পরে খোঁজ নিতে গিয়ে তিনি জানতে পারেন নুর ইসলামের পরিবারও দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যুৎহীন।
এই দুই পরিবারের অবস্থা সরেজমিনে দেখে তিনি সিদ্ধান্ত নেন নিজ দায়িত্বে সংযোগ করে দেওয়ার। পরে বিদ্যুৎ বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে তার নিজের অর্থায়নে প্রয়োজনীয় সব কাজ শেষে চার দিন আগে দুই পরিবারের ঘরে জ্বলে ওঠে সেই বহু প্রত্যাশিত বৈদ্যুতিক আলো।
এ ঘটনা দুই পরিবারে এনে দিয়েছে আনন্দের বন্যা।
বিদ্যুৎ পাওয়ার পর নুর ইসলামের চোখে-মুখে আনন্দ ও স্বস্তির ছাপ তিনি বলেন, পঙ্গু ছেলের চিকিৎসায় যা ছিল সব টাকাই খরচ হয়ে গেছে। একসময় মনে হতো আমাদের ভাগ্যে আর আলো জ্বলা লেখা নেই। সন্ধ্যা নামলেই ঘরটা অন্ধকারে ঢেকে যেত, নাতি–নাতনিদের মুখও ভাল করে দেখা যেত না। এতদিন ধরে মনে মনে শুধু একটা দোয়া করতাম- কবে আমাদের ঘরেও আলো জ্বলবে। জহুরুল ভাই আমাদের বিদ্যুতের সব ব্যবস্থা করে দিলেন। এখন আমাদের ঘর আলোর ঝলমল করছে।
ইদ্রিস আলীর চোখে-মুখে একই উচ্ছ্বাস তিনিও বলেন-আমার বয়স এখন অনেক। চোখেও ঠিকমতো দেখি না। এত বছর ধরে কুপিবাতির ধোঁয়া আর কালি সহ্য করে কাটাইছি। ভাবতাম দারিদ্র্যের কারণে হয়তো জীবনের বাকি সময়টুকুও এইভাবেই অন্ধকারে কাটাতে হবে। বিদ্যুতের বিল দিতে পারব না বলে এতদিন কোনোদিন সাহসই করিনি সংযোগ নেওয়ার। আমি ভাবছিলাম- এই বয়সে আর আলো দেখমু না। কিন্তু আল্লাহর রহমতের কারণে বহু বছরের সেই অন্ধকার দূর হয়ে গেল।
জহুরুল ইসলাম বলেন,“মানুষ হিসেবে তাদের অবস্থাটা আমাকে নাড়া দিয়েছে। তাই নিজ উদ্যোগে বিদ্যুৎ সংযোগের ব্যবস্থা করি। সমাজের সামর্থ্যবান মানুষ সবাই একটু এগিয়ে এলে অন্ধকারে থাকা পরিবারগুলো আলো পেতে পারে।”
পৌরসভার সাবেক মেয়র ও বিএনপি নেতা আলমগীর চৌধুরী বাদশা বলেন, “শতভাগ বিদ্যুতায়নের ঘোষণার পরও দুই পরিবার এত বছর বঞ্চিত ছিল এটা দুঃখজনক। জহুরুল ইসলামের এই মানবিক উদ্যোগ অত্যন্ত প্রশংসনীয়।”
জয়পুরহাট পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আক্কেলপুর জোনের ডিজিএম আব্দুর রহমান সরকার জানান, “খবর পাওয়ার পর নামমাত্র ফিতে সংযোগ দেওয়া হয়েছে। এলাকায় যে কেউ বিদ্যুৎ সুবিধার বাইরে থাকলে তারা যোগাযোগ করলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
বিশ বছরের অন্ধকার শেষে দুই পরিবারের ঘরে জ্বলে ওঠা বৈদ্যুতিক আলো শুধু একটি সুইচ চাপার বিষয় নয়, এটা মানবতার আলো, যা প্রমাণ করে সঠিক সময়ে একটি ছোট উদ্যোগও বদলে দিতে পারে মানুষের পুরো জীবন।

আপনার মতামত লিখুন