জয়পুরহাট    শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
Daily Joypur Barta

বাংলাদেশের রাজনীতিতে আপসহীন নেত্রীর ৪১ বছর



বাংলাদেশের রাজনীতিতে আপসহীন নেত্রীর ৪১ বছর
ছবি-সংগৃহীত

বিএনপি চেয়ারপারসন ও তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া আর নেই। মঙ্গলবার সকাল ৬টায় তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। তার মৃত্যুতে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

গৃহবধূ হিসেবে জীবন শুরু করে রাজনীতিতে এসে প্রায় ৪১ বছর সক্রিয়ভাবে নেতৃত্ব দিয়েছেন খালেদা জিয়া। ১৯৮৪ সালের ১০ মে কাউন্সিলের মাধ্যমে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন। ওই সময় থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি দলটির সর্বোচ্চ দায়িত্বে ছিলেন।

বিএনপির নেতৃত্বের পাশাপাশি তিনি তিনবার দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবেও নির্বাচিত হন। এরশাদবিরোধী আন্দোলনে দৃঢ় অবস্থানের কারণে তিনি ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। একই সঙ্গে তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে রাজনৈতিক ইতিহাসে স্থান করে নেন।

স্বামী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে হারানোর শোক থেকেই শুরু হয় খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক পথচলা। ১৯৮১ সালের ৩০ মে জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর বিএনপি গভীর সংকটে পড়ে। সেই সংকটময় সময়ে গৃহবধূ খালেদা জিয়া রাজনীতিতে সক্রিয় হন। ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি তিনি বিএনপিতে যোগ দেন। ১৯৮৩ সালের মার্চে দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান হন এবং ১ এপ্রিল বর্ধিত সভায় প্রথমবারের মতো বক্তৃতা দেন। বিচারপতি সাত্তার অসুস্থ হয়ে পড়লে তিনি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসনের দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে ১৯৮৪ সালের ১০ মে দলের চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন।

বিএনপির প্রচার বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ১৯৮৩ সালে সাত-দলীয় জোট গঠনের মাধ্যমে জেনারেল এরশাদের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হয়। স্বৈরাচার পতনের দীর্ঘ সংগ্রামে তিনি কোনো ধরনের আপস করেননি। বিভিন্ন সময়ে নিষেধাজ্ঞামূলক আইনের মাধ্যমে তার চলাচলে বাধা দেওয়া হয়। জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর আট বছরে সাতবার অন্তরীণ হয়েও তিনি এরশাদবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন।

দীর্ঘ ৪১ বছরের রাজনৈতিক জীবনে বহু সংকট মোকাবিলা করতে হয়েছে খালেদা জিয়াকে। নব্বইয়ের গণআন্দোলনের পর এবং বিশেষ করে ২০০৮ সালের পর আদালতের আদেশে ক্যান্টনমেন্টের বাসভবন ছাড়তে হয় তাকে। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি হারান ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোকে। ২০১৫ সালের তিন মাসের অবরোধে তার বিরুদ্ধে আগুন সন্ত্রাসের অভিযোগ উঠলেও বিএনপি এসব অভিযোগকে রাজনৈতিক কৌশল বলে দাবি করে আসছে।

জাতীয়তাবাদী চিন্তাবিদ অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদের মতে, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাসে খালেদা জিয়ার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি দেশের অন্যতম জনপ্রিয় নেত্রী ছিলেন এবং কখনোই নির্বাচনে নিজের আসনে পরাজিত হননি।

বিএনপির প্রচার বিভাগ জানায়, বেগম খালেদা জিয়া ১৯৪৬ সালের ১৫ আগস্ট দিনাজপুর জেলার জলপাইগুঁড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা ইস্কান্দার মজুমদার ছিলেন ব্যবসায়ী। আদি নিবাস ছিল ফেনী জেলার ফুলগাজী থানায়। পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে তিনি তৃতীয়। দিনাজপুর মিশনারি স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা শেষে ১৯৬০ সালে দিনাজপুর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেন। ওই বছরই তৎকালীন ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমানের সঙ্গে তার বিয়ে হয়।

এরশাদ আমল ছাড়াও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে ২০০৭ সালের ৩ সেপ্টেম্বর ভোরে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। ক্যান্টনমেন্টের মইনুল রোডের বাসভবন থেকে গ্রেপ্তারের পর তাকে সিএমএম আদালতে নেওয়া হয়। জামিন না হওয়ায় জাতীয় সংসদ ভবন এলাকায় স্থাপিত সাব জেলে রাখা হয়। সেখানে ৩৭২ দিন কারাভোগের পর ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর তিনি মুক্তি পান। কারাবন্দি অবস্থায়ই তার মা বেগম তৈয়বা মজুমদারের মৃত্যু হয়।

২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি দুদকের মামলায় আবারও কারাগারে যেতে হয় খালেদা জিয়াকে। প্রায় দুই বছর পর ২০২০ সালের ২৫ মার্চ করোনাভাইরাস মহামারির সময় শর্তসাপেক্ষে মুক্তি পান তিনি। পরে কয়েক দফায় তার মুক্তির মেয়াদ বাড়ানো হয়। ২০২৫ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পর সরকার পতনের পরদিন রাষ্ট্রপতির ক্ষমতাবলে তিনি দণ্ডমুক্ত হয়ে সম্পূর্ণ মুক্তি পান।

চার দশকের বেশি সময় ধরে খালেদা জিয়া বাংলাদেশের নির্বাচনী রাজনীতিতে অন্যতম প্রভাবশালী ও জনপ্রিয় নেত্রী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ১৯৯১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত তিনি যে কয়টি নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন, প্রতিবারই জয়ী হয়েছেন। ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচন বিএনপি বয়কট করায় তিনি নির্বাচনের বাইরে ছিলেন। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে তার অংশ নেওয়ার কথা ছিল।

খালেদা জিয়া ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। এর মধ্যে ১৯৯৬ সালে তার দ্বিতীয় মেয়াদের দায়িত্বকাল ছিল এক মাস। ১৯৯১ সালে তার নেতৃত্বেই সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। ২০০১ সালে চারদলীয় জোটের নেতৃত্ব দিয়ে তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন তিনি। ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর তিনি বিরোধী দলীয় নেতার দায়িত্ব পালন করেন।

আপনার মতামত লিখুন

Daily Joypur Barta

শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬


বাংলাদেশের রাজনীতিতে আপসহীন নেত্রীর ৪১ বছর

প্রকাশের তারিখ : ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫

featured Image

বিএনপি চেয়ারপারসন ও তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া আর নেই। মঙ্গলবার সকাল ৬টায় তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। তার মৃত্যুতে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

গৃহবধূ হিসেবে জীবন শুরু করে রাজনীতিতে এসে প্রায় ৪১ বছর সক্রিয়ভাবে নেতৃত্ব দিয়েছেন খালেদা জিয়া। ১৯৮৪ সালের ১০ মে কাউন্সিলের মাধ্যমে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন। ওই সময় থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি দলটির সর্বোচ্চ দায়িত্বে ছিলেন।

বিএনপির নেতৃত্বের পাশাপাশি তিনি তিনবার দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবেও নির্বাচিত হন। এরশাদবিরোধী আন্দোলনে দৃঢ় অবস্থানের কারণে তিনি ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। একই সঙ্গে তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে রাজনৈতিক ইতিহাসে স্থান করে নেন।

স্বামী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে হারানোর শোক থেকেই শুরু হয় খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক পথচলা। ১৯৮১ সালের ৩০ মে জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর বিএনপি গভীর সংকটে পড়ে। সেই সংকটময় সময়ে গৃহবধূ খালেদা জিয়া রাজনীতিতে সক্রিয় হন। ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি তিনি বিএনপিতে যোগ দেন। ১৯৮৩ সালের মার্চে দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান হন এবং ১ এপ্রিল বর্ধিত সভায় প্রথমবারের মতো বক্তৃতা দেন। বিচারপতি সাত্তার অসুস্থ হয়ে পড়লে তিনি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসনের দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে ১৯৮৪ সালের ১০ মে দলের চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন।

বিএনপির প্রচার বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ১৯৮৩ সালে সাত-দলীয় জোট গঠনের মাধ্যমে জেনারেল এরশাদের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হয়। স্বৈরাচার পতনের দীর্ঘ সংগ্রামে তিনি কোনো ধরনের আপস করেননি। বিভিন্ন সময়ে নিষেধাজ্ঞামূলক আইনের মাধ্যমে তার চলাচলে বাধা দেওয়া হয়। জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর আট বছরে সাতবার অন্তরীণ হয়েও তিনি এরশাদবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন।

দীর্ঘ ৪১ বছরের রাজনৈতিক জীবনে বহু সংকট মোকাবিলা করতে হয়েছে খালেদা জিয়াকে। নব্বইয়ের গণআন্দোলনের পর এবং বিশেষ করে ২০০৮ সালের পর আদালতের আদেশে ক্যান্টনমেন্টের বাসভবন ছাড়তে হয় তাকে। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি হারান ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোকে। ২০১৫ সালের তিন মাসের অবরোধে তার বিরুদ্ধে আগুন সন্ত্রাসের অভিযোগ উঠলেও বিএনপি এসব অভিযোগকে রাজনৈতিক কৌশল বলে দাবি করে আসছে।

জাতীয়তাবাদী চিন্তাবিদ অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদের মতে, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাসে খালেদা জিয়ার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি দেশের অন্যতম জনপ্রিয় নেত্রী ছিলেন এবং কখনোই নির্বাচনে নিজের আসনে পরাজিত হননি।

বিএনপির প্রচার বিভাগ জানায়, বেগম খালেদা জিয়া ১৯৪৬ সালের ১৫ আগস্ট দিনাজপুর জেলার জলপাইগুঁড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা ইস্কান্দার মজুমদার ছিলেন ব্যবসায়ী। আদি নিবাস ছিল ফেনী জেলার ফুলগাজী থানায়। পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে তিনি তৃতীয়। দিনাজপুর মিশনারি স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা শেষে ১৯৬০ সালে দিনাজপুর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেন। ওই বছরই তৎকালীন ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমানের সঙ্গে তার বিয়ে হয়।

এরশাদ আমল ছাড়াও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে ২০০৭ সালের ৩ সেপ্টেম্বর ভোরে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। ক্যান্টনমেন্টের মইনুল রোডের বাসভবন থেকে গ্রেপ্তারের পর তাকে সিএমএম আদালতে নেওয়া হয়। জামিন না হওয়ায় জাতীয় সংসদ ভবন এলাকায় স্থাপিত সাব জেলে রাখা হয়। সেখানে ৩৭২ দিন কারাভোগের পর ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর তিনি মুক্তি পান। কারাবন্দি অবস্থায়ই তার মা বেগম তৈয়বা মজুমদারের মৃত্যু হয়।

২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি দুদকের মামলায় আবারও কারাগারে যেতে হয় খালেদা জিয়াকে। প্রায় দুই বছর পর ২০২০ সালের ২৫ মার্চ করোনাভাইরাস মহামারির সময় শর্তসাপেক্ষে মুক্তি পান তিনি। পরে কয়েক দফায় তার মুক্তির মেয়াদ বাড়ানো হয়। ২০২৫ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পর সরকার পতনের পরদিন রাষ্ট্রপতির ক্ষমতাবলে তিনি দণ্ডমুক্ত হয়ে সম্পূর্ণ মুক্তি পান।

চার দশকের বেশি সময় ধরে খালেদা জিয়া বাংলাদেশের নির্বাচনী রাজনীতিতে অন্যতম প্রভাবশালী ও জনপ্রিয় নেত্রী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ১৯৯১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত তিনি যে কয়টি নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন, প্রতিবারই জয়ী হয়েছেন। ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচন বিএনপি বয়কট করায় তিনি নির্বাচনের বাইরে ছিলেন। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে তার অংশ নেওয়ার কথা ছিল।

খালেদা জিয়া ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। এর মধ্যে ১৯৯৬ সালে তার দ্বিতীয় মেয়াদের দায়িত্বকাল ছিল এক মাস। ১৯৯১ সালে তার নেতৃত্বেই সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। ২০০১ সালে চারদলীয় জোটের নেতৃত্ব দিয়ে তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন তিনি। ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর তিনি বিরোধী দলীয় নেতার দায়িত্ব পালন করেন।


Daily Joypur Barta



কপিরাইট © ২০২৬ Daily Joypur Barta । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত