জয়পুরহাট    শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
Daily Joypur Barta

কালাইয়ে ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটে অসহায় চাষী : ৯৫ টাকার বস্তা কিনতে হচ্ছে ১২০ টাকায়



কালাইয়ে ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটে অসহায় চাষী : ৯৫ টাকার বস্তা কিনতে হচ্ছে ১২০ টাকায়
ছবি- দৈনিক জয়পুরবার্তা

‘প্রতি ঘন্টায় ঘন্টায় বস্তার দাম বেড়েই চলেছে। ইফতারের আগে যে বস্তার দাম চাওয়া হয়েছে ১১৭ টাকা, ইফতারের পর সেই বস্তার দাম নেওয়া হয়েছে ১২০ টাকা। আকাশের অবস্থা ভাল নয়, বিপদে পরে বেশী দামে বস্তা কিনেছি। দেশে কোনো আইন নেই। ইচ্ছে মত বেচাঁ-কেনা চলছে। গত বুধবার সকালে কালাই পৌরশহরের মেসার্স রহিম ট্রেডার্সে বস্তা ক্রয় করতে এসে এমন কথাগুলো বলছিলেন কালাই উপজেলার আঁওড়া গ্রামের কৃষক মনোয়ার হোসেন।’

সারাদেশে আলু উৎপাদনে দ্বিতীয় জেলা হিসেবে পরিচিত জয়পুরহাট। বর্তমান বাজারে আলুর দাম কম।বিক্রি করলে লোকশান গুণতে হবে চাষীদের। পুষে নিতে চাষীরা তাদের উৎপাদিত আলু বিক্রি না করে হিমাগারে রাখছেন। আলু রাখতে গেলে বস্তার প্রয়োজন। সে কারনে চাহিদা বেড়ে গেছে বস্তার। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ব্যবসায়ীরা যে যার মত করে ইচ্ছেমত দামে পাটের তৈরি বস্তা বিক্রি করছেন।

চাষি ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত সপ্তাহেও প্রতিটি খালি বস্তা ৯০ থেকে ৯৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল। কিন্তু বর্তমানে একই বস্তা বিক্রি হচ্ছে ১১৮ থেকে ১২০ টাকায়। অর্থাৎ অল্প সময়ের ব্যবধানে প্রতি বস্তায় প্রায় ২৫ টাকা পর্যন্ত দাম বেড়েছে। কৃষকদের দাবি, আলুর বাজারদর কমে যাওয়ার কারণে তারা ইতোমধ্যে ক্ষতির মুখে রয়েছেন। এর মধ্যে আবার বস্তার দাম বাড়ায় তাদের খরচ আরও বেড়ে যাচ্ছে। বর্তমানে প্রতি মন আলু জাতভেদে ২৮০ থেকে ৩৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এই দামে আলু বিক্রি করলে অনেক কৃষককে বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়তে হবে, এমনকি মূলধনও হারানোর আশঙ্কা রয়েছে। তাই অনেক চাষি আলু বিক্রি না করে হিমাগারে সংরক্ষণের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। কিন্তু বস্তা কিনতে গিয়ে তাদের অতিরিক্ত ২০ থেকে ২৫ টাকা করে বেশি গুনতে হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন তারা।

চাষীরা বলছেন, চলতি মৌসুমে প্রতি বিঘা জমিতে আলু চাষে সার, বীজ, সেচ, নিড়ানী, ও শ্রমিক খরচ মিলে ব্যয় হয়েছে ৩৩ থেকে ৩৫ হাজার টাকা। অথচ বর্তমানে আলুর বাজার দর পতনের কারনে প্রতি বিঘার আলু বিক্রি করে পাওয়া যাচ্ছে ১৫ থেকে ১৭ হাজার টাকা। গত বছরের লোকশান মাথায় নিয়ে এবারও ধরা চাষীরা। 

কালাই উপজেলার তালোড়া বাইগুনী গ্রামের কৃষক লক্ষণ বর্মণ অভিযোগ করে বলেন, ‘আলুর দাম কমে গেছে, হিমাগারে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। কিন্তু বস্তার দাম বেশী হওয়ায় চরম বিপাকে পড়েছি। দেশের উৎপাদিত পাটের আঁশ থেকে দেশেই কলকারখানাগুলোতে উৎপাদন হয় বস্তার। কি কারণে দাম বেড়েই চলছে, তা আমি বোধগম্য নয়। এ যেন চাষীদের মরার ওপর খড়ার ঘাঁ।’

উপজেলার পুনট পাঁচপাইকা গ্রামের মিঠু ফকির বলেন, ‘এক দিকে আলুর দাম নাই, অন্যদিকে বস্তার দাম বেড়েই চলেছে, এভাবে চলতে থাকলে শেষমেশ যে কি হবে, তা আর বলার উপেক্ষা রাখে না। বাজারে আলুর দাম না বাড়লে এবারও ধরা খাওয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই। তার চেয়ে ভালো আলুর চাষ আর করব না।’

তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করে উপজেলার পুনট বাজারের বস্তা ব্যবসায়ী মিজানুর রহমান বলেন,‘কয়েক মাস আগেও প্রতিমণ পাটের দাম ছিল ৩ হাজার থেকে ৩ হাজার ২’শ টাকা। বর্তমানে এক মণ পাট বিক্রি হচ্ছে ৫ হাজার থেকে ৫ হাজার ৫’শ টাকা। একটি বস্তা তৈরি করতে ৬’শ গ্রাম পাট লাগে। সে তুলনায় ৬’শ গ্রামের পাটের বাজার মূল্য ৭৫ টাকা। তৈরি করতে কারখানা বিল, বিদ্যুৎ বিল, শ্রমিক সব মিলে একটি বস্তা তৈরি করতে ১১০ টাকার মত পড়ে যায়। সে তুলনায় বস্তার দাম বেশী বলে কিভাবে।’বরং  তাদের দাবি,পাটের দাম বেড়ে যাওয়ায় কারখানায় বস্তা উৎপাদনের খরচও বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে বাজারে বস্তার দাম বাড়লেও এতে ব্যবসায়ীদের কোনো ধরনের কারসাজি নেই বলে তারা জানিয়েছেন।

জয়পুরহাট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি অনোয়ারুল হক আনু বলেন,‘বর্তমানে পাটের মজুত কমে গেছে, হঠাৎ করে পাটের তৈরি বস্তার চাহিদা বেড়েছে। তারপরও আমরা এ ব্যাপারে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের সাথে কথা বলব, যাতে সবাই উপকৃত হন।’

জেলা প্রশাসক আল মামুন মিয়া বলেন, বিষয়টি শুনেছি, বিনা কারনে যদি ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে বৃদ্ধি দামে বস্তা বিক্রি করে তাহলে অবশ্যই ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্তা নেয়া হবে।’

আপনার মতামত লিখুন

Daily Joypur Barta

শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬


কালাইয়ে ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটে অসহায় চাষী : ৯৫ টাকার বস্তা কিনতে হচ্ছে ১২০ টাকায়

প্রকাশের তারিখ : ১৪ মার্চ ২০২৬

featured Image

‘প্রতি ঘন্টায় ঘন্টায় বস্তার দাম বেড়েই চলেছে। ইফতারের আগে যে বস্তার দাম চাওয়া হয়েছে ১১৭ টাকা, ইফতারের পর সেই বস্তার দাম নেওয়া হয়েছে ১২০ টাকা। আকাশের অবস্থা ভাল নয়, বিপদে পরে বেশী দামে বস্তা কিনেছি। দেশে কোনো আইন নেই। ইচ্ছে মত বেচাঁ-কেনা চলছে। গত বুধবার সকালে কালাই পৌরশহরের মেসার্স রহিম ট্রেডার্সে বস্তা ক্রয় করতে এসে এমন কথাগুলো বলছিলেন কালাই উপজেলার আঁওড়া গ্রামের কৃষক মনোয়ার হোসেন।’

সারাদেশে আলু উৎপাদনে দ্বিতীয় জেলা হিসেবে পরিচিত জয়পুরহাট। বর্তমান বাজারে আলুর দাম কম।বিক্রি করলে লোকশান গুণতে হবে চাষীদের। পুষে নিতে চাষীরা তাদের উৎপাদিত আলু বিক্রি না করে হিমাগারে রাখছেন। আলু রাখতে গেলে বস্তার প্রয়োজন। সে কারনে চাহিদা বেড়ে গেছে বস্তার। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ব্যবসায়ীরা যে যার মত করে ইচ্ছেমত দামে পাটের তৈরি বস্তা বিক্রি করছেন।

চাষি ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত সপ্তাহেও প্রতিটি খালি বস্তা ৯০ থেকে ৯৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল। কিন্তু বর্তমানে একই বস্তা বিক্রি হচ্ছে ১১৮ থেকে ১২০ টাকায়। অর্থাৎ অল্প সময়ের ব্যবধানে প্রতি বস্তায় প্রায় ২৫ টাকা পর্যন্ত দাম বেড়েছে। কৃষকদের দাবি, আলুর বাজারদর কমে যাওয়ার কারণে তারা ইতোমধ্যে ক্ষতির মুখে রয়েছেন। এর মধ্যে আবার বস্তার দাম বাড়ায় তাদের খরচ আরও বেড়ে যাচ্ছে। বর্তমানে প্রতি মন আলু জাতভেদে ২৮০ থেকে ৩৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এই দামে আলু বিক্রি করলে অনেক কৃষককে বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়তে হবে, এমনকি মূলধনও হারানোর আশঙ্কা রয়েছে। তাই অনেক চাষি আলু বিক্রি না করে হিমাগারে সংরক্ষণের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। কিন্তু বস্তা কিনতে গিয়ে তাদের অতিরিক্ত ২০ থেকে ২৫ টাকা করে বেশি গুনতে হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন তারা।

চাষীরা বলছেন, চলতি মৌসুমে প্রতি বিঘা জমিতে আলু চাষে সার, বীজ, সেচ, নিড়ানী, ও শ্রমিক খরচ মিলে ব্যয় হয়েছে ৩৩ থেকে ৩৫ হাজার টাকা। অথচ বর্তমানে আলুর বাজার দর পতনের কারনে প্রতি বিঘার আলু বিক্রি করে পাওয়া যাচ্ছে ১৫ থেকে ১৭ হাজার টাকা। গত বছরের লোকশান মাথায় নিয়ে এবারও ধরা চাষীরা। 

কালাই উপজেলার তালোড়া বাইগুনী গ্রামের কৃষক লক্ষণ বর্মণ অভিযোগ করে বলেন, ‘আলুর দাম কমে গেছে, হিমাগারে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। কিন্তু বস্তার দাম বেশী হওয়ায় চরম বিপাকে পড়েছি। দেশের উৎপাদিত পাটের আঁশ থেকে দেশেই কলকারখানাগুলোতে উৎপাদন হয় বস্তার। কি কারণে দাম বেড়েই চলছে, তা আমি বোধগম্য নয়। এ যেন চাষীদের মরার ওপর খড়ার ঘাঁ।’

উপজেলার পুনট পাঁচপাইকা গ্রামের মিঠু ফকির বলেন, ‘এক দিকে আলুর দাম নাই, অন্যদিকে বস্তার দাম বেড়েই চলেছে, এভাবে চলতে থাকলে শেষমেশ যে কি হবে, তা আর বলার উপেক্ষা রাখে না। বাজারে আলুর দাম না বাড়লে এবারও ধরা খাওয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই। তার চেয়ে ভালো আলুর চাষ আর করব না।’

তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করে উপজেলার পুনট বাজারের বস্তা ব্যবসায়ী মিজানুর রহমান বলেন,‘কয়েক মাস আগেও প্রতিমণ পাটের দাম ছিল ৩ হাজার থেকে ৩ হাজার ২’শ টাকা। বর্তমানে এক মণ পাট বিক্রি হচ্ছে ৫ হাজার থেকে ৫ হাজার ৫’শ টাকা। একটি বস্তা তৈরি করতে ৬’শ গ্রাম পাট লাগে। সে তুলনায় ৬’শ গ্রামের পাটের বাজার মূল্য ৭৫ টাকা। তৈরি করতে কারখানা বিল, বিদ্যুৎ বিল, শ্রমিক সব মিলে একটি বস্তা তৈরি করতে ১১০ টাকার মত পড়ে যায়। সে তুলনায় বস্তার দাম বেশী বলে কিভাবে।’বরং  তাদের দাবি,পাটের দাম বেড়ে যাওয়ায় কারখানায় বস্তা উৎপাদনের খরচও বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে বাজারে বস্তার দাম বাড়লেও এতে ব্যবসায়ীদের কোনো ধরনের কারসাজি নেই বলে তারা জানিয়েছেন।

জয়পুরহাট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি অনোয়ারুল হক আনু বলেন,‘বর্তমানে পাটের মজুত কমে গেছে, হঠাৎ করে পাটের তৈরি বস্তার চাহিদা বেড়েছে। তারপরও আমরা এ ব্যাপারে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের সাথে কথা বলব, যাতে সবাই উপকৃত হন।’

জেলা প্রশাসক আল মামুন মিয়া বলেন, বিষয়টি শুনেছি, বিনা কারনে যদি ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে বৃদ্ধি দামে বস্তা বিক্রি করে তাহলে অবশ্যই ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্তা নেয়া হবে।’


Daily Joypur Barta



কপিরাইট © ২০২৬ Daily Joypur Barta । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত