জয়পুরহাট    শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
Daily Joypur Barta

‎কমলনগরে বৃদ্ধ মায়ের কান্না

পেটের মেয়েই আমার শেষ সম্বলটুকু নিয়ে গেল



পেটের মেয়েই আমার শেষ সম্বলটুকু নিয়ে গেল
ছবি- প্রতিনিধি

“স্বামী নেই, বয়স হয়েছে। শরীরটাও ভালো যায় না। জীবনের শেষ বয়সে একটু ভরসা করে বেঁচে থাকার জন্য যে জমিটুকু ছিল, সেটাও নাকি আমার কাছ থেকে লিখে নেওয়া হয়েছে। আমি তো আমার মেয়েকে বিশ্বাস করেছিলাম। নিজের পেটের মেয়েই যদি আমার সঙ্গে এমন করে, তাহলে আমি কার কাছে যাব?

‎কথাগুলো বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন নুর জাহান বেগম। একপর্যায়ে চোখের পানি মুছতে মুছতে তিনি বলেন, “আমার শেষ সম্বলটুকুও যদি না থাকে, তাহলে শেষ বয়সে আমাকে দেখবে কে?

‎লক্ষ্মীপুরের কমলনগর উপজেলার হাজিরহাট ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের এই বৃদ্ধার অভিযোগ, তাঁর ছোট মেয়ে নিলুফা আক্তার কাকন ও মেয়ের স্বামী দলিল লেখক মো. হোসেন কৌশলে তাঁকে বাড়িতে নিয়ে গিয়ে প্রায় সাড়ে ১৩ শতাংশ জমি তাঁদের সন্তানদের নামে রেজিস্ট্রি করে নিয়েছেন। বিষয়টি জানতে পেরে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন তিনি। লক্ষ্মীপুর আদালতে করা মামলাটির নম্বর সিআর ৭৬০/২৬।

‎নুর জাহান বেগমের পরিবারের সদস্যদের দেওয়া তথ্য ও মামলার অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, তাঁর স্বামী মৃত মমিন উদ্দিনের নামে ২৫-১০৯৫৬ খতিয়ানের আগত খতিয়ান ৩৭৮৭-এর জাঙ্গালিয়া মৌজার ৪৫০৩৯ দাগে জমি ছিল। স্বামীর মৃত্যুর পর ওয়ারিশসূত্রে ওই সম্পত্তিতে অংশ পান নুর জাহান বেগম। পরিবারের দাবি, পরে তিনি নিজের অংশের জমি নামজারিও করেন।

‎‎স্বামী হারানোর পর সংসারের নানা প্রতিকূলতার মধ্যে ওই জমিই ছিল তাঁর ভবিষ্যৎ জীবনের অন্যতম অবলম্বন। কিন্তু সেই জমিটুকু নিয়েই এখন জন্ম নিয়েছে মা ও মেয়ের মধ্যে বিরোধ।

‎‎নুর জাহান বেগমের পরিবারের অভিযোগ, তাঁর ছোট মেয়ে নিলুফা আক্তার কাকন ও তাঁর স্বামী মো. হোসেন তাঁকে তাঁদের বাড়িতে নিয়ে যান। কিস্তির টাকা নেওয়ার কথা বলে তাঁকে সেখানে নেওয়া হলেও পরে তাঁর কাছ থেকে জমির দলিল করে নেওয়া হয় বলে পরিবারের সদস্যরা দাবি করেছেন।

‎‎পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় সাড়ে ১৩ শতাংশ জমি নিলুফা আক্তার কাকন, তাঁর স্বামী মো. হোসেনসহ তাঁদের তিন মেয়ে—স্মৃতি, মনিয়া ও মুনজারিনের নামে রেজিস্ট্রি করে নিয়েছে। 

‎‎নুর জাহান বেগমের মেয়ে ফরিদা আক্তার চিনুর দাবি, তাঁর মায়ের কাছ থেকে নেওয়া জমির বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৭০ লাখ টাকা। অথচ দলিলে জমিটির মূল্য ৭ লাখ টাকা উল্লেখ করা হয়েছে বলে তিনি জানান এতে প্রমান হয় তার মায়ের কাছ থেকে প্রতারণা করে জমিটি নিয়েছে।

‎‎ফরিদা আক্তার চিনু বলেন, “আমার মা সহজ-সরল মানুষ। তিনি জমি-জমার হিসাব তেমন বোঝেন না। তাঁর কাছ থেকে কীভাবে, কোন পরিস্থিতিতে জমি নেওয়া হয়েছে—এটা আমরা জানতে চাই। দলিলে যে মূল্য দেখানো হয়েছে, তার সঙ্গে বর্তমান বাজারমূল্যের অনেক পার্থক্য। এ কারণেই বিষয়টি নিয়ে আমাদের প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

‎নুর জাহান বেগমের মেয়ে নাছরিন বেগম নয়ন বলেন, “আমরা ওয়ারিশসূত্রে পাওয়া জমি মাপার জন্য গেলে আমার বোন ও তাঁর স্বামী আমাদের একটি দলিল দেখান। তাঁরা বলেন, ওই জমি তাঁরা মায়ের কাছ থেকে কিনে নিয়েছেন। দলিলের কথা শুনে মা খুব কষ্ট পান। এরপর তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন।

‎‎তিনি বলেন, “আমরা চাই বিষয়টি সঠিকভাবে তদন্ত হোক। মা যদি নিজের ইচ্ছায় জমি বিক্রি করে থাকেন, তাহলে সেটাও পরিষ্কার হোক। আর যদি তাঁকে ভুল বুঝিয়ে বা প্রতারণা করে দলিল করানো হয়ে থাকে, তাহলে সেটারও বিচার হওয়া দরকার।

‎‎নুর জাহান বেগমের ছোট ছেলে শিমুল বলেন, “আমার বোনের স্বামী দলিল লেখক। জমি-জমার বিষয়ে তাঁর ভালো ধারণা রয়েছে। আমার মাকে তাঁদের বাড়িতে নিয়ে কিস্তির টাকা নেওয়ার কথা বলা হয়েছিল বলে আমরা জানতে পারি। পরে জানতে পারি, মায়ের কাছ থেকে জমি লিখে নেওয়া হয়েছে।

‎‎সাংবাদিকের সামনে নিজের কষ্টের কথা বলতে গিয়ে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়েন নুর জাহান বেগম।‎তিনি বলেন, “আমি তো তাদের মা। আমার সন্তানদের জন্য কত কষ্ট করেছি। স্বামী মারা যাওয়ার পরও সন্তানদের নিয়েই বেঁচে আছি। 

কখনো ভাবিনি, আমার জীবনের শেষ সময়ে নিজের সন্তানদের কাছেই আমার জমির হিসাব চাইতে হবে।‎কিছুক্ষণ নীরব থেকে তিনি বলেন, “আমি বেশি কিছু চাই না। আমার সঙ্গে কী হয়েছে, শুধু সেটার সত্যটা বের হোক। আমি বৃদ্ধ মানুষ। শেষ বয়সে মাথা গোঁজার একটা জায়গা আর চিকিৎসার জন্য একটু ভরসা চাই।

‎‎অভিযোগের বিষয়ে মো. হোসেন বলেন, “আমার মেয়েরা আমার শাশুড়ির কাছ থেকে ৭ লাখ টাকা দিয়ে এই জমি কিনেছে। আমি এই বিষয়ে আর কিছু জানি না।

‎‎পরিবারের সদস্যরা জানান, বিষয়টি নিয়ে বিরোধের পর নুর জাহান বেগম শেষ পর্যন্ত আদালতের শরণাপন্ন হয়েছেন। তাঁর করা সিআর মামলা নম্বর ৭৬০/২৬।

‎এখন আদালতের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে জমিটি কীভাবে হস্তান্তর হয়েছে, দলিলে উল্লেখিত অর্থ প্রকৃতপক্ষে পরিশোধ করা হয়েছিল কি না এবং নুর জাহান বেগম কী পরিস্থিতিতে দলিলে স্বাক্ষর করেছেন—এসব প্রশ্নের উত্তর মিলবে বলে আশা করছেন তাঁর পরিবারের সদস্যরা।

‎

আপনার মতামত লিখুন

Daily Joypur Barta

শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬


পেটের মেয়েই আমার শেষ সম্বলটুকু নিয়ে গেল

প্রকাশের তারিখ : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

“স্বামী নেই, বয়স হয়েছে। শরীরটাও ভালো যায় না। জীবনের শেষ বয়সে একটু ভরসা করে বেঁচে থাকার জন্য যে জমিটুকু ছিল, সেটাও নাকি আমার কাছ থেকে লিখে নেওয়া হয়েছে। আমি তো আমার মেয়েকে বিশ্বাস করেছিলাম। নিজের পেটের মেয়েই যদি আমার সঙ্গে এমন করে, তাহলে আমি কার কাছে যাব?

‎কথাগুলো বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন নুর জাহান বেগম। একপর্যায়ে চোখের পানি মুছতে মুছতে তিনি বলেন, “আমার শেষ সম্বলটুকুও যদি না থাকে, তাহলে শেষ বয়সে আমাকে দেখবে কে?

‎লক্ষ্মীপুরের কমলনগর উপজেলার হাজিরহাট ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের এই বৃদ্ধার অভিযোগ, তাঁর ছোট মেয়ে নিলুফা আক্তার কাকন ও মেয়ের স্বামী দলিল লেখক মো. হোসেন কৌশলে তাঁকে বাড়িতে নিয়ে গিয়ে প্রায় সাড়ে ১৩ শতাংশ জমি তাঁদের সন্তানদের নামে রেজিস্ট্রি করে নিয়েছেন। বিষয়টি জানতে পেরে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন তিনি। লক্ষ্মীপুর আদালতে করা মামলাটির নম্বর সিআর ৭৬০/২৬।

‎নুর জাহান বেগমের পরিবারের সদস্যদের দেওয়া তথ্য ও মামলার অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, তাঁর স্বামী মৃত মমিন উদ্দিনের নামে ২৫-১০৯৫৬ খতিয়ানের আগত খতিয়ান ৩৭৮৭-এর জাঙ্গালিয়া মৌজার ৪৫০৩৯ দাগে জমি ছিল। স্বামীর মৃত্যুর পর ওয়ারিশসূত্রে ওই সম্পত্তিতে অংশ পান নুর জাহান বেগম। পরিবারের দাবি, পরে তিনি নিজের অংশের জমি নামজারিও করেন।

‎‎স্বামী হারানোর পর সংসারের নানা প্রতিকূলতার মধ্যে ওই জমিই ছিল তাঁর ভবিষ্যৎ জীবনের অন্যতম অবলম্বন। কিন্তু সেই জমিটুকু নিয়েই এখন জন্ম নিয়েছে মা ও মেয়ের মধ্যে বিরোধ।

‎‎নুর জাহান বেগমের পরিবারের অভিযোগ, তাঁর ছোট মেয়ে নিলুফা আক্তার কাকন ও তাঁর স্বামী মো. হোসেন তাঁকে তাঁদের বাড়িতে নিয়ে যান। কিস্তির টাকা নেওয়ার কথা বলে তাঁকে সেখানে নেওয়া হলেও পরে তাঁর কাছ থেকে জমির দলিল করে নেওয়া হয় বলে পরিবারের সদস্যরা দাবি করেছেন।

‎‎পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় সাড়ে ১৩ শতাংশ জমি নিলুফা আক্তার কাকন, তাঁর স্বামী মো. হোসেনসহ তাঁদের তিন মেয়ে—স্মৃতি, মনিয়া ও মুনজারিনের নামে রেজিস্ট্রি করে নিয়েছে। 

‎‎নুর জাহান বেগমের মেয়ে ফরিদা আক্তার চিনুর দাবি, তাঁর মায়ের কাছ থেকে নেওয়া জমির বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৭০ লাখ টাকা। অথচ দলিলে জমিটির মূল্য ৭ লাখ টাকা উল্লেখ করা হয়েছে বলে তিনি জানান এতে প্রমান হয় তার মায়ের কাছ থেকে প্রতারণা করে জমিটি নিয়েছে।

‎‎ফরিদা আক্তার চিনু বলেন, “আমার মা সহজ-সরল মানুষ। তিনি জমি-জমার হিসাব তেমন বোঝেন না। তাঁর কাছ থেকে কীভাবে, কোন পরিস্থিতিতে জমি নেওয়া হয়েছে—এটা আমরা জানতে চাই। দলিলে যে মূল্য দেখানো হয়েছে, তার সঙ্গে বর্তমান বাজারমূল্যের অনেক পার্থক্য। এ কারণেই বিষয়টি নিয়ে আমাদের প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

‎নুর জাহান বেগমের মেয়ে নাছরিন বেগম নয়ন বলেন, “আমরা ওয়ারিশসূত্রে পাওয়া জমি মাপার জন্য গেলে আমার বোন ও তাঁর স্বামী আমাদের একটি দলিল দেখান। তাঁরা বলেন, ওই জমি তাঁরা মায়ের কাছ থেকে কিনে নিয়েছেন। দলিলের কথা শুনে মা খুব কষ্ট পান। এরপর তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন।

‎‎তিনি বলেন, “আমরা চাই বিষয়টি সঠিকভাবে তদন্ত হোক। মা যদি নিজের ইচ্ছায় জমি বিক্রি করে থাকেন, তাহলে সেটাও পরিষ্কার হোক। আর যদি তাঁকে ভুল বুঝিয়ে বা প্রতারণা করে দলিল করানো হয়ে থাকে, তাহলে সেটারও বিচার হওয়া দরকার।

‎‎নুর জাহান বেগমের ছোট ছেলে শিমুল বলেন, “আমার বোনের স্বামী দলিল লেখক। জমি-জমার বিষয়ে তাঁর ভালো ধারণা রয়েছে। আমার মাকে তাঁদের বাড়িতে নিয়ে কিস্তির টাকা নেওয়ার কথা বলা হয়েছিল বলে আমরা জানতে পারি। পরে জানতে পারি, মায়ের কাছ থেকে জমি লিখে নেওয়া হয়েছে।

‎‎সাংবাদিকের সামনে নিজের কষ্টের কথা বলতে গিয়ে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়েন নুর জাহান বেগম।‎তিনি বলেন, “আমি তো তাদের মা। আমার সন্তানদের জন্য কত কষ্ট করেছি। স্বামী মারা যাওয়ার পরও সন্তানদের নিয়েই বেঁচে আছি। 

কখনো ভাবিনি, আমার জীবনের শেষ সময়ে নিজের সন্তানদের কাছেই আমার জমির হিসাব চাইতে হবে।‎কিছুক্ষণ নীরব থেকে তিনি বলেন, “আমি বেশি কিছু চাই না। আমার সঙ্গে কী হয়েছে, শুধু সেটার সত্যটা বের হোক। আমি বৃদ্ধ মানুষ। শেষ বয়সে মাথা গোঁজার একটা জায়গা আর চিকিৎসার জন্য একটু ভরসা চাই।

‎‎অভিযোগের বিষয়ে মো. হোসেন বলেন, “আমার মেয়েরা আমার শাশুড়ির কাছ থেকে ৭ লাখ টাকা দিয়ে এই জমি কিনেছে। আমি এই বিষয়ে আর কিছু জানি না।

‎‎পরিবারের সদস্যরা জানান, বিষয়টি নিয়ে বিরোধের পর নুর জাহান বেগম শেষ পর্যন্ত আদালতের শরণাপন্ন হয়েছেন। তাঁর করা সিআর মামলা নম্বর ৭৬০/২৬।

‎এখন আদালতের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে জমিটি কীভাবে হস্তান্তর হয়েছে, দলিলে উল্লেখিত অর্থ প্রকৃতপক্ষে পরিশোধ করা হয়েছিল কি না এবং নুর জাহান বেগম কী পরিস্থিতিতে দলিলে স্বাক্ষর করেছেন—এসব প্রশ্নের উত্তর মিলবে বলে আশা করছেন তাঁর পরিবারের সদস্যরা।

‎


Daily Joypur Barta



কপিরাইট © ২০২৬ Daily Joypur Barta । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত