জয়পুরহাট    বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
Daily Joypur Barta

পত্নীতলায় নেচে-গেয়ে কারাম উৎসব উদযাপন



পত্নীতলায় নেচে-গেয়ে কারাম উৎসব উদযাপন
ছবি- প্রতিনিধি

কারাম ডালকে ঘিরে পূজা, উপবাস, কিচ্ছা আর নাচ-গান। নতুন প্রজন্মের কাছে নিজেদের ইতিহাস, বিশ্বাস ও সংস্কৃতি তুলে ধরার আয়োজন। এমন বর্ণিল পরিবেশে নওগাঁর পত্নীতলায় উদযাপিত হয়েছে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী কারাম উৎসব।

বুধবার বিকেলে উপজেলার নজিপুর হাইস্কুল মাঠে জাতীয় আদিবাসী পরিষদ পত্নীতলা উপজেলা শাখার আয়োজনে অনুষ্ঠিত হয় আদিবাসী সমাবেশ ও সাংস্কৃতিক মিলনমেলা। এতে পত্নীতলা ছাড়াও মহাদেবপুর, নিয়ামতপুর, পোরশা ও ধামইরহাটসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে অর্ধশতাধিক সাংস্কৃতিক দল অংশ নেয়।

এর আগে মঙ্গলবার বুজরুক মামুদপুর গ্রামে অনুষ্ঠিত হয় কারাম পূজার মূল আয়োজন। দিনভর উপবাসের পর সন্ধ্যায় একদল কিশোরী কারামগাছের ডাল কেটে এনে পূজার বেদিতে স্থাপন করেন। পরে দিয়াবাতি, জাওয়া ডালি ও ফলমূল উৎসর্গ করে শুরু হয় পূজার আনুষ্ঠানিকতা।

রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পূজাস্থলে জড়ো হন শিশু-কিশোরসহ বিভিন্ন বয়সী মানুষ। পুরোহিতের কিচ্ছায় উঠে আসে কার্মা ও ধার্মা দুই ভাইয়ের কাহিনি। কিচ্ছা শেষে নারীরা পরস্পরকে খাবারের আমন্ত্রণ জানিয়ে উপবাস ভাঙেন। এরপর কারাম ডাল ঘিরে ঢাক, মাদল ও করতালের তালে শুরু হয় নাচ-গান।

বুধবার বিকেলে ধর্মীয় আচার শেষে গীত গাইতে গাইতে কারাম ডাল নিয়ে যাওয়া হয় নজিপুর হাইস্কুল মাঠে। সেখানে ডালটি স্থাপন করে বিভিন্ন স্থান থেকে আসা নৃত্যদলগুলো পরিবেশন করে ঐতিহ্যবাহী নৃত্য। নাচ-গান ও উৎসবের আমেজে মুখর হয়ে ওঠে পুরো মাঠ। পরে কারাম ডাল তুলে আত্রাই নদীতে বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় পূজার আনুষ্ঠানিকতা।

ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষের কাছে কারাম মূলত ফসলকেন্দ্রিক উৎসব। ভাদ্র মাসের শুক্লপক্ষে অনুষ্ঠিত এ উৎসবকে অনেকে ‘ডালপূজা’ও বলেন। কারাম বৃক্ষের সঙ্গে কৃষি ও প্রকৃতির গভীর সম্পর্ক রয়েছে বলে বিশ্বাস করেন তাঁরা। উৎসবের বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে জমির উর্বরতা, ভালো ফসল ও পরিবারের মঙ্গল কামনা করা হয়।

উৎসবে অংশ নেওয়া বুজরুক গ্রামের বিসরি এক্কা, সোহাগী টপ্প্যা ও ধরনাই বিজিপাড়ার সবিতা কুজুরসহ কয়েকজন নারী বলেন, আগে প্রতিবছর গ্রামে কারাম উৎসব হতো। খরচের কারণে এখন প্রতিবছর আয়োজন করা সম্ভব হয় না। সহযোগিতা পেলে আবারও উৎসবের আয়োজন করা হয়। উৎসবকে ঘিরে গ্রামে আনন্দের পরিবেশ তৈরি হয়, আত্মীয়-স্বজনেরাও আসেন।

জাতীয় আদিবাসী পরিষদ পত্নীতলা উপজেলা শাখার সভাপতি সুবোধ ওঁরাও বলেন, ‘কারাম ডাল ভ্রাতৃত্বের প্রতীক। প্রকৃতি, কৃষি ও মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের কথাও এই উৎসব মনে করিয়ে দেয়। আধুনিকতার প্রভাবের মধ্যেও এই ঐতিহ্য ধরে রাখা জরুরি। পত্নীতলা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউটের পরিচালক যোগেন্দ্র নাথ সরকার বলেন, নওগাঁর প্রায় সব উপজেলাতেই ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের বসবাস রয়েছে। 

উৎসবে বিএনপির কেন্দ্রীয় কৃষি বিষয়ক সম্পাদক এবং সাবেক এমপি সামসুজ্জোহা খান জোহা, পত্নীতলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রিফাত আরা, চলচ্চিত্র শিল্পী ড্যানি সিডাক, ইনফরমাল সেক্টর ইন্ডাস্ট্রি স্কিল কাউন্সিলের চেয়ারম্যান মির্জা নুরুল গণি শোভন, অ্যাসেড ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক মুরাদ,উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল ফারুকসহ বিভিন্ন  রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ  নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন।

আয়োজকদের মতে, কারাম উৎসব শুধু ধর্মীয় আচার বা বিনোদনের আয়োজন নয়; এটি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ভাষা, সংস্কৃতি, বিশ্বাস ও ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। নাচ, গান ও লোকজ আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বেঁচে থাকছে এই ঐতিহ্য।


আপনার মতামত লিখুন

Daily Joypur Barta

বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬


পত্নীতলায় নেচে-গেয়ে কারাম উৎসব উদযাপন

প্রকাশের তারিখ : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

কারাম ডালকে ঘিরে পূজা, উপবাস, কিচ্ছা আর নাচ-গান। নতুন প্রজন্মের কাছে নিজেদের ইতিহাস, বিশ্বাস ও সংস্কৃতি তুলে ধরার আয়োজন। এমন বর্ণিল পরিবেশে নওগাঁর পত্নীতলায় উদযাপিত হয়েছে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী কারাম উৎসব।

বুধবার বিকেলে উপজেলার নজিপুর হাইস্কুল মাঠে জাতীয় আদিবাসী পরিষদ পত্নীতলা উপজেলা শাখার আয়োজনে অনুষ্ঠিত হয় আদিবাসী সমাবেশ ও সাংস্কৃতিক মিলনমেলা। এতে পত্নীতলা ছাড়াও মহাদেবপুর, নিয়ামতপুর, পোরশা ও ধামইরহাটসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে অর্ধশতাধিক সাংস্কৃতিক দল অংশ নেয়।

এর আগে মঙ্গলবার বুজরুক মামুদপুর গ্রামে অনুষ্ঠিত হয় কারাম পূজার মূল আয়োজন। দিনভর উপবাসের পর সন্ধ্যায় একদল কিশোরী কারামগাছের ডাল কেটে এনে পূজার বেদিতে স্থাপন করেন। পরে দিয়াবাতি, জাওয়া ডালি ও ফলমূল উৎসর্গ করে শুরু হয় পূজার আনুষ্ঠানিকতা।

রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পূজাস্থলে জড়ো হন শিশু-কিশোরসহ বিভিন্ন বয়সী মানুষ। পুরোহিতের কিচ্ছায় উঠে আসে কার্মা ও ধার্মা দুই ভাইয়ের কাহিনি। কিচ্ছা শেষে নারীরা পরস্পরকে খাবারের আমন্ত্রণ জানিয়ে উপবাস ভাঙেন। এরপর কারাম ডাল ঘিরে ঢাক, মাদল ও করতালের তালে শুরু হয় নাচ-গান।

বুধবার বিকেলে ধর্মীয় আচার শেষে গীত গাইতে গাইতে কারাম ডাল নিয়ে যাওয়া হয় নজিপুর হাইস্কুল মাঠে। সেখানে ডালটি স্থাপন করে বিভিন্ন স্থান থেকে আসা নৃত্যদলগুলো পরিবেশন করে ঐতিহ্যবাহী নৃত্য। নাচ-গান ও উৎসবের আমেজে মুখর হয়ে ওঠে পুরো মাঠ। পরে কারাম ডাল তুলে আত্রাই নদীতে বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় পূজার আনুষ্ঠানিকতা।

ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষের কাছে কারাম মূলত ফসলকেন্দ্রিক উৎসব। ভাদ্র মাসের শুক্লপক্ষে অনুষ্ঠিত এ উৎসবকে অনেকে ‘ডালপূজা’ও বলেন। কারাম বৃক্ষের সঙ্গে কৃষি ও প্রকৃতির গভীর সম্পর্ক রয়েছে বলে বিশ্বাস করেন তাঁরা। উৎসবের বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে জমির উর্বরতা, ভালো ফসল ও পরিবারের মঙ্গল কামনা করা হয়।

উৎসবে অংশ নেওয়া বুজরুক গ্রামের বিসরি এক্কা, সোহাগী টপ্প্যা ও ধরনাই বিজিপাড়ার সবিতা কুজুরসহ কয়েকজন নারী বলেন, আগে প্রতিবছর গ্রামে কারাম উৎসব হতো। খরচের কারণে এখন প্রতিবছর আয়োজন করা সম্ভব হয় না। সহযোগিতা পেলে আবারও উৎসবের আয়োজন করা হয়। উৎসবকে ঘিরে গ্রামে আনন্দের পরিবেশ তৈরি হয়, আত্মীয়-স্বজনেরাও আসেন।

জাতীয় আদিবাসী পরিষদ পত্নীতলা উপজেলা শাখার সভাপতি সুবোধ ওঁরাও বলেন, ‘কারাম ডাল ভ্রাতৃত্বের প্রতীক। প্রকৃতি, কৃষি ও মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের কথাও এই উৎসব মনে করিয়ে দেয়। আধুনিকতার প্রভাবের মধ্যেও এই ঐতিহ্য ধরে রাখা জরুরি। পত্নীতলা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউটের পরিচালক যোগেন্দ্র নাথ সরকার বলেন, নওগাঁর প্রায় সব উপজেলাতেই ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের বসবাস রয়েছে। 

উৎসবে বিএনপির কেন্দ্রীয় কৃষি বিষয়ক সম্পাদক এবং সাবেক এমপি সামসুজ্জোহা খান জোহা, পত্নীতলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রিফাত আরা, চলচ্চিত্র শিল্পী ড্যানি সিডাক, ইনফরমাল সেক্টর ইন্ডাস্ট্রি স্কিল কাউন্সিলের চেয়ারম্যান মির্জা নুরুল গণি শোভন, অ্যাসেড ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক মুরাদ,উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল ফারুকসহ বিভিন্ন  রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ  নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন।

আয়োজকদের মতে, কারাম উৎসব শুধু ধর্মীয় আচার বা বিনোদনের আয়োজন নয়; এটি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ভাষা, সংস্কৃতি, বিশ্বাস ও ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। নাচ, গান ও লোকজ আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বেঁচে থাকছে এই ঐতিহ্য।



Daily Joypur Barta



কপিরাইট © ২০২৬ Daily Joypur Barta । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত