ঈশান কোণের মেঘ
-মাধুরী ব্যানার্জী
গ্রামের নাম শালবনি। চারদিকে ধানের মাঠ, দূরে তালগাছের সারি, আর মাঝখান দিয়ে বয়ে গেছে ছোট্ট এক নদী। গ্রামের মানুষদের একটা বিশ্বাস ছিল—ঈশান কোণে যদি কালো মেঘ জমে, তবে শুধু বৃষ্টি নয়, জীবনেরও কোনো বড় পরিবর্তন এসে দরজায় কড়া নাড়ে।
মেঘলা সেই বিকেলে স্কুলশিক্ষক অরিন্দম নদীর ধারে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাঁর স্ত্রী মৃণালিনী দীর্ঘদিন অসুস্থ। চিকিৎসার জন্য শহরে যাওয়ার টাকা জোগাড় করতে না পেরে তিনি প্রায় আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন।
হঠাৎ গ্রামের প্রবীণ মানুষ হরিবাবু এসে বললেন, — "ঈশান কোণের মেঘকে ভয় পেও না বাবা। অনেক সময় কালো মেঘই আলো নিয়ে আসে।"
অরিন্দম শুধু মৃদু হেসে আকাশের দিকে তাকালেন। সত্যিই, ঈশান কোণে জমেছে ঘন নীল-কালো মেঘ।
সেই রাতেই প্রবল ঝড়-বৃষ্টি শুরু হলো। গ্রামের পুরোনো বাঁধ ভেঙে যাওয়ার উপক্রম। সবাই যখন প্রাণপণে বাঁধ বাঁচাতে ছুটল, অরিন্দমও তাঁদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়ালেন। তাঁর সাহস আর নেতৃত্বে বাঁধ রক্ষা পেল।
পরদিন জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা ক্ষয়ক্ষতি দেখতে এসে জানতে পারলেন, একজন সাধারণ শিক্ষক নিজের জীবন বিপন্ন করে পুরো গ্রামকে রক্ষা করেছেন। তাঁর সেই মানবিক সাহসের কথা সংবাদপত্রে প্রকাশিত হলো।
কয়েক দিনের মধ্যেই একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা অরিন্দমের স্ত্রীর চিকিৎসার সমস্ত দায়িত্ব নিল। ধীরে ধীরে মৃণালিনী সুস্থ হয়ে উঠলেন।
একদিন সন্ধ্যায় দু'জনে নদীর ধারে বসে ছিলেন। আকাশে আবার ঈশান কোণে মেঘ জমেছে। কিন্তু এবার সেই মেঘ আর ভয়ের প্রতীক নয়—সে যেন আশার দূত।
মৃণালিনী হাসতে হাসতে বললেন, — "দেখো, মানুষ মেঘকে অন্ধকার বলে। অথচ সেই মেঘই তো বৃষ্টি হয়ে শুকিয়ে যাওয়া মাটিকে নতুন জীবন দেয়।"
অরিন্দম আকাশের দিকে তাকিয়ে উত্তর দিলেন, — "জীবনও ঠিক তেমনই। যে দুঃখকে আমরা অভিশাপ ভাবি, অনেক সময় সেই দুঃখই ভবিষ্যতের আশীর্বাদ হয়ে ফিরে আসে।"
ঈশান কোণের মেঘ ধীরে ধীরে সাদা আলোয় ভেসে গেল। আর শালবনির মানুষ বুঝল—প্রকৃতির প্রতিটি সংকেত ভয়ের নয়; কিছু সংকেত নতুন সূচনারও হয়।

শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১২ জুলাই ২০২৬
ঈশান কোণের মেঘ
-মাধুরী ব্যানার্জী
গ্রামের নাম শালবনি। চারদিকে ধানের মাঠ, দূরে তালগাছের সারি, আর মাঝখান দিয়ে বয়ে গেছে ছোট্ট এক নদী। গ্রামের মানুষদের একটা বিশ্বাস ছিল—ঈশান কোণে যদি কালো মেঘ জমে, তবে শুধু বৃষ্টি নয়, জীবনেরও কোনো বড় পরিবর্তন এসে দরজায় কড়া নাড়ে।
মেঘলা সেই বিকেলে স্কুলশিক্ষক অরিন্দম নদীর ধারে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাঁর স্ত্রী মৃণালিনী দীর্ঘদিন অসুস্থ। চিকিৎসার জন্য শহরে যাওয়ার টাকা জোগাড় করতে না পেরে তিনি প্রায় আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন।
হঠাৎ গ্রামের প্রবীণ মানুষ হরিবাবু এসে বললেন, — "ঈশান কোণের মেঘকে ভয় পেও না বাবা। অনেক সময় কালো মেঘই আলো নিয়ে আসে।"
অরিন্দম শুধু মৃদু হেসে আকাশের দিকে তাকালেন। সত্যিই, ঈশান কোণে জমেছে ঘন নীল-কালো মেঘ।
সেই রাতেই প্রবল ঝড়-বৃষ্টি শুরু হলো। গ্রামের পুরোনো বাঁধ ভেঙে যাওয়ার উপক্রম। সবাই যখন প্রাণপণে বাঁধ বাঁচাতে ছুটল, অরিন্দমও তাঁদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়ালেন। তাঁর সাহস আর নেতৃত্বে বাঁধ রক্ষা পেল।
পরদিন জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা ক্ষয়ক্ষতি দেখতে এসে জানতে পারলেন, একজন সাধারণ শিক্ষক নিজের জীবন বিপন্ন করে পুরো গ্রামকে রক্ষা করেছেন। তাঁর সেই মানবিক সাহসের কথা সংবাদপত্রে প্রকাশিত হলো।
কয়েক দিনের মধ্যেই একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা অরিন্দমের স্ত্রীর চিকিৎসার সমস্ত দায়িত্ব নিল। ধীরে ধীরে মৃণালিনী সুস্থ হয়ে উঠলেন।
একদিন সন্ধ্যায় দু'জনে নদীর ধারে বসে ছিলেন। আকাশে আবার ঈশান কোণে মেঘ জমেছে। কিন্তু এবার সেই মেঘ আর ভয়ের প্রতীক নয়—সে যেন আশার দূত।
মৃণালিনী হাসতে হাসতে বললেন, — "দেখো, মানুষ মেঘকে অন্ধকার বলে। অথচ সেই মেঘই তো বৃষ্টি হয়ে শুকিয়ে যাওয়া মাটিকে নতুন জীবন দেয়।"
অরিন্দম আকাশের দিকে তাকিয়ে উত্তর দিলেন, — "জীবনও ঠিক তেমনই। যে দুঃখকে আমরা অভিশাপ ভাবি, অনেক সময় সেই দুঃখই ভবিষ্যতের আশীর্বাদ হয়ে ফিরে আসে।"
ঈশান কোণের মেঘ ধীরে ধীরে সাদা আলোয় ভেসে গেল। আর শালবনির মানুষ বুঝল—প্রকৃতির প্রতিটি সংকেত ভয়ের নয়; কিছু সংকেত নতুন সূচনারও হয়।

আপনার মতামত লিখুন