জয়পুরহাট    শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
Daily Joypur Barta

আতঙ্কের সড়কে এখন স্বস্তির যাত্রা! নিরাপদে যাচ্ছে যানবাহন



আতঙ্কের সড়কে এখন স্বস্তির যাত্রা! নিরাপদে যাচ্ছে যানবাহন
ছবি- প্রতিনিধি

সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে একসময় জনশূন্য হয়ে পড়ত নওগাঁর সারাইগাছী-চাঁপাইনবাবগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়কের দীর্ঘ একটি অংশ। দিনের ব্যস্ত সড়কটিই রাতের আঁধারে হয়ে উঠত আতঙ্কের। কখনো গাছ ফেলে সড়ক আটকে দেওয়া, কখনো রামদা কিংবা লোহার রড হাতে পথরোধ ডাকাত দলের এমন তৎপরতায় চালক ও যাত্রীদের পাশাপাশি সড়কের দুই পাশের ব্যবসায়ীরাও ছিলেন চরম নিরাপত্তাহীনতায়।

রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ত আতঙ্ক। দূরপাল্লার পণ্যবাহী ট্রাক কিংবা পিকআপ চালকেরা বাধ্য হয়ে দলবদ্ধভাবে চলার চেষ্টা করতেন। সড়কের পাশে থাকা বাজারগুলোর ব্যবসায়ীদের অনেকেই সন্ধ্যা হওয়ার আগেই দোকানের ঝাঁপ নামিয়ে দিতেন। কারণ, দোকানে দিনের বিক্রির টাকা রেখে যাওয়াও ছিল ঝুঁকিপূর্ণ।

সেই চিত্র এখন আর নেই। নওগাঁ জেলা পুলিশের পরিকল্পিত ও ধারাবাহিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বদলে গেছে সড়কটির রাতের দৃশ্যপট। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় চেকপোস্ট, সারাইগাছী মোড়ে পুলিশ বক্স, সোলার লাইট, বিশেষ পুলিশ মোতায়েন, নিয়মিত টহল এবং রাত ৯টার পর পুলিশের বিশেষ ‘এসকর্ট’ সেবায় নিরাপদে পার করা হচ্ছে যানবাহন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অতীতের ডাকাতদের গ্রেপ্তার এবং বিশেষ অভিযান।

জেলা পুলিশের তথ্য বলছে, গত বছর নওগাঁয় সড়কটিতে ১৬টি ডাকাতি ও দস্যুতার ঘটনা ঘটলেও গত সাত মাসে এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি। ফলে যে পথে রাতের যাত্রা ছিল দুশ্চিন্তার, সেই পথেই এখন গভীর রাতেও স্বাভাবিক গতিতে চলছে যানবাহন। সড়কটির অতীতের ভয়াবহতার অন্যতম দৃষ্টান্ত পোরশা উপজেলার বেজোড়া বাজারের ঘটনা। গত বছরের ডিসেম্বরে এক রাতেই বাজারটির ২০টি দোকানে ডাকাতি ও ভাঙচুর করা হয়।

ওই ঘটনার পর ব্যবসায়ীদের মধ্যে আতঙ্ক আরও বেড়ে যায়। সন্ধ্যার পর দোকান খোলা রাখা নিয়েই তৈরি হয় উদ্বেগ। শুধু বাজার নয়, সড়কেও ছিল একই আতঙ্ক। গাছ ফেলে পথ আটকে যানবাহন থামানো হতো। এরপর চালক ও যাত্রীদের ভয়ভীতি দেখিয়ে কেড়ে নেওয়া হতো টাকা-পয়সা ও সঙ্গে থাকা মালামাল। ফলে সন্ধ্যার পর এ সড়কে চলাচল অনেকের কাছেই হয়ে উঠেছিল বড় ধরনের ঝুঁকি।

সম্প্রতি মধ্যরাতে সারাইগাছী মোড় থেকে বন্ধু পাড়া মোড় পর্যন্ত সড়কটি ঘুরে দেখা যায়, রাতের নিরাপত্তায় পুলিশের বিশেষ প্রস্তুতি। সড়কের গুরুত্বপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ জায়গাগুলোতে রয়েছে চেকপোস্ট। সারাইগাছী মোড়ে স্থাপন করা হয়েছে পুলিশ বক্স। কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বসানো হয়েছে সোলার লাইট। ঝুঁকিপূর্ণ মোড়গুলোতে দায়িত্ব পালন করছেন বিশেষ পুলিশ সদস্যরা।

চেকপোস্টে সন্দেহজনক কোনো যানবাহন চোখে পড়লে সেটি থামিয়ে তল্লাশি করা হচ্ছে। আর রাত ৯টার পর ঝুঁকিপূর্ণ অংশে একা একা না গিয়ে যানবাহনগুলোকে একত্র করে পুলিশের নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যে দিয়ে পার করে দেওয়া হচ্ছে। এ সময় সড়কে পুলিশের বিশেষ টিমের নিয়মিত টহলও রয়েছে। ফলে একদিকে যেমন অপরাধীদের ওপর নজরদারি বাড়ছে, অন্যদিকে চালক ও যাত্রীদের মধ্যেও তৈরি হয়েছে নিরাপত্তার অনুভূতি।

ডাকাতির ভয় সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছিল সড়কের পাশের ব্যবসায়ীদের জীবনে। বেজোড়া বাজারের ইলেকট্রিক দোকানি ইসমাইল ইসলাম সেই সময়ের কথা মনে করে বলেন, এই রোডে আমাদের উপরে আগে অনেক নির্যাতন হয়েছে। সড়কে গাছ ফেলে রোড ডাকাতি হয়েছে। সন্ধ্যার পরে ডাকাতরা আমাদের অনেক ব্যবসায়ীকে মারধর করে টাকা-পয়সা ছিনিয়ে নিয়ে গেছে। প্রায় সময় আমাদের বাজারে বিভিন্ন দোকানে ডাকাতি করে সর্বস্ব লুটি নিয়ে গেছে।

বর্তমান পরিস্থিতির কথা জানিয়ে তিনি বলেন, এখন আর আমাদের ভয় নেই। আমাদের বাজারে নিয়মিত রাত্রিবেলায় পুলিশ ডিউটি করছে। যার কারণে আগে যেখানে সন্ধ্যা সাতটা-আটটার মধ্যেই দোকান বন্ধ করে দিতে হতো, এখন রাত ১০টা পর্যন্ত দোকান খোলা রেখে ব্যবসা করতে পারছি। পুলিশের উদ্যোগের প্রশংসা করে তিনি বলেন, এমন উদ্যোগ গ্রহণের জন্য জেলা পুলিশকে ধন্যবাদ জানাই।

বাজারটির সেলুন ব্যবসায়ী সুবির দাস জানালেন, বদলে গেছে রাতের অভিজ্ঞতা। তিনি বলেন, আগে বাজারে প্রায় ডাকাতি হতো। দোকানে কোনো ক্যাশ রেখে যাওয়া যেত না। রাতের বেলা ঘুমাতেও স্বাচ্ছন্দ্য কাজ করত না। মনে হতো কখন যেন দোকান চুরি হয়ে যাচ্ছে। এখন আর সেই ভয় নেই। নির্বিঘ্নে বাড়ি যেয়ে ঘুমাতে পারি।

সড়কের দায়িত্বে থাকা পোরশা থানার উপপরিদর্শক (এসআই) অমিত কুমার দাস বলেন, পুলিশ সুপার স্যারের নির্দেশনাই আমরা সড়কের দায়িত্ব পালন করছি। আমাদের সীমানার যে ঝুঁকিপূর্ণ অংশটি রয়েছে, এখানে প্রায় ছয়টি চেকপোস্টের মাধ্যমে গাড়িগুলোকে পার করা হয়ে থাকে। ফলে এখন আর কোনো ঝুঁকি নেই। পুলিশের এই ব্যবস্থায় রাতের নির্দিষ্ট সময়ে যানবাহনগুলোকে একত্র করা হচ্ছে। সন্দেহজনক যানবাহনে তল্লাশি চালানোর পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ অংশে পুলিশের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হচ্ছে।

নওগাঁর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম বলেন, পত্নীতলা থেকে পোরশা হয়ে আড্ডা পর্যন্ত সড়কটি দীর্ঘদিন ধরে অপরাধপ্রবণ হিসেবে পরিচিত ছিল। এ পথে আগে নিয়মিত ডাকাতি ও দস্যুতার ঘটনা ঘটত।

তিনি বলেন, নওগাঁ জেলায় গত বছর ১৬টি ডাকাতির ঘটনা ঘটে। আমি এই জেলায় যোগদান করার পর আমরা এই পূর্বাপর ইতিহাসগুলো স্টাডি করি এবং আমরা কয়েকটা ধাপে কাজ শুরু করি।


পুলিশ সুপার জানান, প্রথমেই পোরশা থানায় জনবল বাড়ানো হয়। পাশাপাশি বাড়ানো হয় লজিস্টিকস ও গাড়ির সংখ্যা। অতীতে সংঘটিত ডাকাতির মামলাগুলো পর্যালোচনা করে আসামিদের গ্রেপ্তারে বিশেষ টিম গঠন করা হয়। পরে ওই টিমের মাধ্যমে ডাকাতদের গ্রেপ্তার করা হয়। শুধু দৃশ্যমান পুলিশি উপস্থিতির মধ্যেই ব্যবস্থা সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি। সড়কের বিভিন্ন অংশে গোপনে অবস্থান নেওয়া এবং বিশেষ অভিযান পরিচালনার মাধ্যমেও অপরাধীদের ওপর নজর রাখা হচ্ছে। পুলিশ সুপার বলেন, আমরা ওই সড়কে এখনো মাঝে মাঝে ওত পেতে থাকি এবং স্পেশাল ড্রাইভ দেই। যাতে আমরা ডাকাতি প্রতিরোধ করতে পারি।”

পুলিশের নেওয়া একাধিক পদক্ষেপ একসঙ্গে কার্যকর করার পর পরিস্থিতিতে পরিবর্তন আসে। পুলিশ সুপারের ভাষ্য অনুযায়ী, পাঁচ-ছয়টি ধাপে কাজ শুরু করার পর ফেব্রুয়ারি থেকে এ সড়কে আর কোনো ডাকাতির ঘটনা ঘটেনি। তবে ডাকাতির ঘটনা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা কমানো হয়নি। বরং সড়কটিতে পুলিশের অবস্থান আরও শক্ত করা হয়েছে।

সম্প্রতি স্থানীয় জনসাধারণের সহযোগিতায় পুলিশের উদ্যোগে বেশ কিছু সোলার লাইটও স্থাপন করা হয়েছে। এতে অন্ধকারাচ্ছন্ন ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো আলোকিত হয়েছে।


নওগাঁর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম বলেন, একটা কথা পরিষ্কারভাবে আমি বলে দিচ্ছি, যারা এই সড়কে অপরাধ করতো বা অপরাধ করার ইচ্ছা আছে, তাদের বিরুদ্ধে জেলা পুলিশ আইন অনুযায়ী সর্বোচ্চ কঠোর ব্যবস্থা নিবে। পোরশা, সাপাহার এবং সারাইগাছী, আড্ডা, এই সড়কে ডাকাতির অধ্যায় আমরা স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে চাই।

একসময় সন্ধ্যার পর যে সড়কে চলাচল মানেই ছিল উৎকণ্ঠা, সেই সড়কে এখন রাত দুই-তিনটাতেও রোগী নিয়ে ছুটছে সিএনজি, পণ্য নিয়ে ছুটছে পিকআপ ও ট্রাক। বেজোড়া বাজারের ব্যবসায়ীরা আগের মতো সন্ধ্যা হলেই দোকানের ঝাঁপ নামিয়ে দিচ্ছেন না। বরং রাত ১০টা পর্যন্ত ব্যবসা করার সুযোগ পাচ্ছেন।

চেকপোস্ট, এসকর্ট, টহল, বিশেষ অভিযান এবং স্থানীয় মানুষের সহযোগিতায় সড়কটির নিরাপত্তায় যে পরিবর্তন এসেছে, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ গত সাত মাসে ডাকাতি ও দস্যুতার কোনো ঘটনা ঘটেনি। আতঙ্কের সেই সড়ক এখন আর শুধু একটি যাতায়াতের পথ নয়। রাতের নিরাপদ চলাচলের ওপর মানুষের আস্থাও ধীরে ধীরে ফিরিয়ে আনছে।



আপনার মতামত লিখুন

Daily Joypur Barta

শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬


আতঙ্কের সড়কে এখন স্বস্তির যাত্রা! নিরাপদে যাচ্ছে যানবাহন

প্রকাশের তারিখ : ৩০ আগস্ট ২০২৬

featured Image

সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে একসময় জনশূন্য হয়ে পড়ত নওগাঁর সারাইগাছী-চাঁপাইনবাবগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়কের দীর্ঘ একটি অংশ। দিনের ব্যস্ত সড়কটিই রাতের আঁধারে হয়ে উঠত আতঙ্কের। কখনো গাছ ফেলে সড়ক আটকে দেওয়া, কখনো রামদা কিংবা লোহার রড হাতে পথরোধ ডাকাত দলের এমন তৎপরতায় চালক ও যাত্রীদের পাশাপাশি সড়কের দুই পাশের ব্যবসায়ীরাও ছিলেন চরম নিরাপত্তাহীনতায়।

রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ত আতঙ্ক। দূরপাল্লার পণ্যবাহী ট্রাক কিংবা পিকআপ চালকেরা বাধ্য হয়ে দলবদ্ধভাবে চলার চেষ্টা করতেন। সড়কের পাশে থাকা বাজারগুলোর ব্যবসায়ীদের অনেকেই সন্ধ্যা হওয়ার আগেই দোকানের ঝাঁপ নামিয়ে দিতেন। কারণ, দোকানে দিনের বিক্রির টাকা রেখে যাওয়াও ছিল ঝুঁকিপূর্ণ।

সেই চিত্র এখন আর নেই। নওগাঁ জেলা পুলিশের পরিকল্পিত ও ধারাবাহিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বদলে গেছে সড়কটির রাতের দৃশ্যপট। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় চেকপোস্ট, সারাইগাছী মোড়ে পুলিশ বক্স, সোলার লাইট, বিশেষ পুলিশ মোতায়েন, নিয়মিত টহল এবং রাত ৯টার পর পুলিশের বিশেষ ‘এসকর্ট’ সেবায় নিরাপদে পার করা হচ্ছে যানবাহন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অতীতের ডাকাতদের গ্রেপ্তার এবং বিশেষ অভিযান।

জেলা পুলিশের তথ্য বলছে, গত বছর নওগাঁয় সড়কটিতে ১৬টি ডাকাতি ও দস্যুতার ঘটনা ঘটলেও গত সাত মাসে এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি। ফলে যে পথে রাতের যাত্রা ছিল দুশ্চিন্তার, সেই পথেই এখন গভীর রাতেও স্বাভাবিক গতিতে চলছে যানবাহন। সড়কটির অতীতের ভয়াবহতার অন্যতম দৃষ্টান্ত পোরশা উপজেলার বেজোড়া বাজারের ঘটনা। গত বছরের ডিসেম্বরে এক রাতেই বাজারটির ২০টি দোকানে ডাকাতি ও ভাঙচুর করা হয়।

ওই ঘটনার পর ব্যবসায়ীদের মধ্যে আতঙ্ক আরও বেড়ে যায়। সন্ধ্যার পর দোকান খোলা রাখা নিয়েই তৈরি হয় উদ্বেগ। শুধু বাজার নয়, সড়কেও ছিল একই আতঙ্ক। গাছ ফেলে পথ আটকে যানবাহন থামানো হতো। এরপর চালক ও যাত্রীদের ভয়ভীতি দেখিয়ে কেড়ে নেওয়া হতো টাকা-পয়সা ও সঙ্গে থাকা মালামাল। ফলে সন্ধ্যার পর এ সড়কে চলাচল অনেকের কাছেই হয়ে উঠেছিল বড় ধরনের ঝুঁকি।

সম্প্রতি মধ্যরাতে সারাইগাছী মোড় থেকে বন্ধু পাড়া মোড় পর্যন্ত সড়কটি ঘুরে দেখা যায়, রাতের নিরাপত্তায় পুলিশের বিশেষ প্রস্তুতি। সড়কের গুরুত্বপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ জায়গাগুলোতে রয়েছে চেকপোস্ট। সারাইগাছী মোড়ে স্থাপন করা হয়েছে পুলিশ বক্স। কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বসানো হয়েছে সোলার লাইট। ঝুঁকিপূর্ণ মোড়গুলোতে দায়িত্ব পালন করছেন বিশেষ পুলিশ সদস্যরা।

চেকপোস্টে সন্দেহজনক কোনো যানবাহন চোখে পড়লে সেটি থামিয়ে তল্লাশি করা হচ্ছে। আর রাত ৯টার পর ঝুঁকিপূর্ণ অংশে একা একা না গিয়ে যানবাহনগুলোকে একত্র করে পুলিশের নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যে দিয়ে পার করে দেওয়া হচ্ছে। এ সময় সড়কে পুলিশের বিশেষ টিমের নিয়মিত টহলও রয়েছে। ফলে একদিকে যেমন অপরাধীদের ওপর নজরদারি বাড়ছে, অন্যদিকে চালক ও যাত্রীদের মধ্যেও তৈরি হয়েছে নিরাপত্তার অনুভূতি।

ডাকাতির ভয় সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছিল সড়কের পাশের ব্যবসায়ীদের জীবনে। বেজোড়া বাজারের ইলেকট্রিক দোকানি ইসমাইল ইসলাম সেই সময়ের কথা মনে করে বলেন, এই রোডে আমাদের উপরে আগে অনেক নির্যাতন হয়েছে। সড়কে গাছ ফেলে রোড ডাকাতি হয়েছে। সন্ধ্যার পরে ডাকাতরা আমাদের অনেক ব্যবসায়ীকে মারধর করে টাকা-পয়সা ছিনিয়ে নিয়ে গেছে। প্রায় সময় আমাদের বাজারে বিভিন্ন দোকানে ডাকাতি করে সর্বস্ব লুটি নিয়ে গেছে।

বর্তমান পরিস্থিতির কথা জানিয়ে তিনি বলেন, এখন আর আমাদের ভয় নেই। আমাদের বাজারে নিয়মিত রাত্রিবেলায় পুলিশ ডিউটি করছে। যার কারণে আগে যেখানে সন্ধ্যা সাতটা-আটটার মধ্যেই দোকান বন্ধ করে দিতে হতো, এখন রাত ১০টা পর্যন্ত দোকান খোলা রেখে ব্যবসা করতে পারছি। পুলিশের উদ্যোগের প্রশংসা করে তিনি বলেন, এমন উদ্যোগ গ্রহণের জন্য জেলা পুলিশকে ধন্যবাদ জানাই।

বাজারটির সেলুন ব্যবসায়ী সুবির দাস জানালেন, বদলে গেছে রাতের অভিজ্ঞতা। তিনি বলেন, আগে বাজারে প্রায় ডাকাতি হতো। দোকানে কোনো ক্যাশ রেখে যাওয়া যেত না। রাতের বেলা ঘুমাতেও স্বাচ্ছন্দ্য কাজ করত না। মনে হতো কখন যেন দোকান চুরি হয়ে যাচ্ছে। এখন আর সেই ভয় নেই। নির্বিঘ্নে বাড়ি যেয়ে ঘুমাতে পারি।

সড়কের দায়িত্বে থাকা পোরশা থানার উপপরিদর্শক (এসআই) অমিত কুমার দাস বলেন, পুলিশ সুপার স্যারের নির্দেশনাই আমরা সড়কের দায়িত্ব পালন করছি। আমাদের সীমানার যে ঝুঁকিপূর্ণ অংশটি রয়েছে, এখানে প্রায় ছয়টি চেকপোস্টের মাধ্যমে গাড়িগুলোকে পার করা হয়ে থাকে। ফলে এখন আর কোনো ঝুঁকি নেই। পুলিশের এই ব্যবস্থায় রাতের নির্দিষ্ট সময়ে যানবাহনগুলোকে একত্র করা হচ্ছে। সন্দেহজনক যানবাহনে তল্লাশি চালানোর পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ অংশে পুলিশের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হচ্ছে।

নওগাঁর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম বলেন, পত্নীতলা থেকে পোরশা হয়ে আড্ডা পর্যন্ত সড়কটি দীর্ঘদিন ধরে অপরাধপ্রবণ হিসেবে পরিচিত ছিল। এ পথে আগে নিয়মিত ডাকাতি ও দস্যুতার ঘটনা ঘটত।

তিনি বলেন, নওগাঁ জেলায় গত বছর ১৬টি ডাকাতির ঘটনা ঘটে। আমি এই জেলায় যোগদান করার পর আমরা এই পূর্বাপর ইতিহাসগুলো স্টাডি করি এবং আমরা কয়েকটা ধাপে কাজ শুরু করি।


পুলিশ সুপার জানান, প্রথমেই পোরশা থানায় জনবল বাড়ানো হয়। পাশাপাশি বাড়ানো হয় লজিস্টিকস ও গাড়ির সংখ্যা। অতীতে সংঘটিত ডাকাতির মামলাগুলো পর্যালোচনা করে আসামিদের গ্রেপ্তারে বিশেষ টিম গঠন করা হয়। পরে ওই টিমের মাধ্যমে ডাকাতদের গ্রেপ্তার করা হয়। শুধু দৃশ্যমান পুলিশি উপস্থিতির মধ্যেই ব্যবস্থা সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি। সড়কের বিভিন্ন অংশে গোপনে অবস্থান নেওয়া এবং বিশেষ অভিযান পরিচালনার মাধ্যমেও অপরাধীদের ওপর নজর রাখা হচ্ছে। পুলিশ সুপার বলেন, আমরা ওই সড়কে এখনো মাঝে মাঝে ওত পেতে থাকি এবং স্পেশাল ড্রাইভ দেই। যাতে আমরা ডাকাতি প্রতিরোধ করতে পারি।”

পুলিশের নেওয়া একাধিক পদক্ষেপ একসঙ্গে কার্যকর করার পর পরিস্থিতিতে পরিবর্তন আসে। পুলিশ সুপারের ভাষ্য অনুযায়ী, পাঁচ-ছয়টি ধাপে কাজ শুরু করার পর ফেব্রুয়ারি থেকে এ সড়কে আর কোনো ডাকাতির ঘটনা ঘটেনি। তবে ডাকাতির ঘটনা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা কমানো হয়নি। বরং সড়কটিতে পুলিশের অবস্থান আরও শক্ত করা হয়েছে।

সম্প্রতি স্থানীয় জনসাধারণের সহযোগিতায় পুলিশের উদ্যোগে বেশ কিছু সোলার লাইটও স্থাপন করা হয়েছে। এতে অন্ধকারাচ্ছন্ন ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো আলোকিত হয়েছে।


নওগাঁর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম বলেন, একটা কথা পরিষ্কারভাবে আমি বলে দিচ্ছি, যারা এই সড়কে অপরাধ করতো বা অপরাধ করার ইচ্ছা আছে, তাদের বিরুদ্ধে জেলা পুলিশ আইন অনুযায়ী সর্বোচ্চ কঠোর ব্যবস্থা নিবে। পোরশা, সাপাহার এবং সারাইগাছী, আড্ডা, এই সড়কে ডাকাতির অধ্যায় আমরা স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে চাই।

একসময় সন্ধ্যার পর যে সড়কে চলাচল মানেই ছিল উৎকণ্ঠা, সেই সড়কে এখন রাত দুই-তিনটাতেও রোগী নিয়ে ছুটছে সিএনজি, পণ্য নিয়ে ছুটছে পিকআপ ও ট্রাক। বেজোড়া বাজারের ব্যবসায়ীরা আগের মতো সন্ধ্যা হলেই দোকানের ঝাঁপ নামিয়ে দিচ্ছেন না। বরং রাত ১০টা পর্যন্ত ব্যবসা করার সুযোগ পাচ্ছেন।

চেকপোস্ট, এসকর্ট, টহল, বিশেষ অভিযান এবং স্থানীয় মানুষের সহযোগিতায় সড়কটির নিরাপত্তায় যে পরিবর্তন এসেছে, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ গত সাত মাসে ডাকাতি ও দস্যুতার কোনো ঘটনা ঘটেনি। আতঙ্কের সেই সড়ক এখন আর শুধু একটি যাতায়াতের পথ নয়। রাতের নিরাপদ চলাচলের ওপর মানুষের আস্থাও ধীরে ধীরে ফিরিয়ে আনছে।




Daily Joypur Barta



কপিরাইট © ২০২৬ Daily Joypur Barta । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত