জয়পুরহাট    শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬
Daily Joypur Barta

জীবনে যা অর্জন করেছি,তার একটি অংশ মানুষের কল্যাণে ব্যয় করে যেতে চাই



জীবনে যা অর্জন করেছি,তার একটি অংশ মানুষের কল্যাণে ব্যয় করে যেতে চাই
ছবি- সংগৃহীত

ডা: ওসমান গণি দীর্ঘ কর্মজীবন কাটিয়েছেন লন্ডনে। শিকড়ের টানে ২০২১ সালে সেই জীবন ছেড়ে জয়পুরহাটের আক্কেলপুর উপজেলার নিজ গ্রাম মনইল-কানুপুরে ফিরে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন তিনি। দেশে ফেরার আগেই লন্ডনে বসে গ্রামের মানুষের জন্য বিভিন্ন উন্নয়নকাজ শুরু করেছিলেন তিনি। তাঁর অর্থায়নে হয়েছে মসজিদ,কবরস্থান, ঈদগাহ মাঠ, পুকুরঘাট, কমিউনিটি সেন্টার, বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান ভবন ও পাঠাগার। দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য চালু করেছিলেন শিক্ষাবৃত্তিও। 

ডা: ওসমান গণিরর বাড়ির সীমানাপ্রাচীর আর ঘরের দেয়ালে ঝুলছে ফ্রেমে বাঁধানো নানা বাণী। নির্মাণশৈলী ও সাজসজ্জায় বিদেশে কাটানো জীবনের ছাপ স্পষ্ট। এত বড় বাড়িতে একাই থাকেন বাড়ির মালিক ডা: ওসমান গণি সরদার (৯১)। পেশায় চিকিৎসক। তাঁকে দেখভালের জন্য আছেন দুজন গৃহকর্মী। স্ত্রী ও সন্তানেরা এখনো লন্ডনে।

ডা: ওসমান গণি দীর্ঘ কর্মজীবন কাটিয়েছেন লন্ডনে। সেখানেই থেকে যাওয়ার সুযোগ ছিল,কিন্তু শিকড়ের টানে ২০২১ সালে সেই জীবন ছেড়ে জয়পুরহাটের আক্কেলপুর উপজেলার নিজ গ্রাম মনইল-কানুপুরে ফিরে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন তিনি। দেশে ফেরার আগেই লন্ডনে বসে গ্রামের মানুষের জন্য বিভিন্ন উন্নয়নকাজ শুরু করেছিলেন তিনি। এখন গ্রামে থেকে সেসব কাজ নিজেই তদারক করছেন।

ডা: ওসমান গণি বলেন, এসব কাজে অন্য কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের অর্থসহায়তা নেই। নিজের উপার্জিত অর্থেই ব্যয় মিটিয়েছেন। তাঁর হিসাবে, এ পর্যন্ত খরচ হয়েছে ২৫ থেকে ৩০ কোটি টাকা। লন্ডনে থাকতেই নিজের নামে ডা. ওসমান গণি সরদার ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তবে ফাউন্ডেশনে তেমন অর্থসহায়তা না পাওয়ায় নিজের অর্থেই কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন বলে জানান। 

মনইল-কানুপুর ও আশপাশের এলাকায় তাঁর অর্থায়নে হয়েছে মসজিদ, কবরস্থান, ঈদগাহ মাঠ, পুকুরঘাট, কমিউনিটি সেন্টার, বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান ভবন ও পাঠাগার। চিকিৎসাসেবার জন্য প্রতিষ্ঠা করেছেন ডা. ওসমান গণি পল্লী ক্লিনিক (যেখানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বিভিন্ন ধরনের রোগী দেখে থাকেন)। দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য চালু করেছিলেন শিক্ষাবৃত্তিও।

এসব প্রকল্পের মধ্যে সবচেয়ে বড়গুলোর একটি গ্রামের মসজিদ। ডা: ওসমান গণি ও স্থানীয় বাসিন্দাদের তথ্য অনুযায়ী, নির্মাণকাজে এ পর্যন্ত প্রায় আট কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। কাজ এখনো চলছে। এ কাজেও অন্য কারও কাছ থেকে অর্থ নেওয়া হয়নি বলে দাবি তাঁর। গ্রামের বাইরেও কাজ করেছেন এই চিকিৎসক। আক্কেলপুর পৌরশহরে তাঁর অর্থায়নে তৈরি হয়েছে আক্কেলপুর আদর্শ ক্লাব ও পাঠাগারের নতুন ভবন। 

ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক রাব্বি হায়দার চৌধুরী জানান, ব্রিটিশ আমলে প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানটির পুরোনো ভবন ছিল আধা পাকা। ডা: ওসমান গণি আদর্শ কমিউনিটি সেন্টার কাম আদর্শ ক্লাব নামে ভবনটি পুনর্নির্মাণ করে দিয়েছেন। 

কানুপুর উচ্চবিদ্যালয়ে বিজ্ঞান ভবন, পাঠাগার ও হলরুম করে দিয়েছেন। বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, কৃতী শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় সহায়তার পাশাপাশি দরিদ্র মানুষের বাড়িঘর নির্মাণেও সহযোগিতা করেন ডা: ওসমান গণি। মেধাবী ও দরিদ্র শিক্ষার্থীদের জন্য ২০১৩ সালে চালু করেছিলেন শিক্ষাবৃত্তি। কয়েক বছর বন্ধ থাকার পর আবার কার্যক্রম শুরু হয়েছে।

গ্রামের মানুষের চিকিৎসার জন্য প্রতিষ্ঠিত পল্লীক্লিনিক একসময় নিজেই রোগী দেখতেন ডা: ওসমান গণি। বয়সের কারণে এখন নিয়মিত সেখানে বসতে পারেন না। তবে রোগীরা বাড়িতে গেলে পরামর্শ দেন। প্রয়োজনে ওষুধ কেনার জন্য অর্থসহায়তাও দেন।

ডা: ওসমান গণির ছোট ভাই বীর মুক্তিযোদ্ধা ও অবসরপ্রাপ্ত কলেজ শিক্ষক নজরুল হায়দার বলেন, ‘আমার বড় ভাই লন্ডনে থাকা অবস্থায় গ্রামের মানুষদের নিয়ে ভাবতেন। সেই পরিকল্পনা থেকেই কাজ করেছেন। প্রকল্পগুলো তিনি নিজেই তদারক করেছেন।

আক্কেলপুর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও উপজেলা বিএনপির সভাপতি কামরুজ্জামান কমল বলেন, ডা: ওসমান গণি নিজের গ্রামের মানুষের জন্য ক্লিনিক,কমিউনিটি সেন্টারসহ নানা উন্নয়নকাজ করেছেন। 

মনইল-কানুপুর গ্রামের এক মধ্যবিত্ত কৃষক পরিবারে জন্ম ওসমান গণির। ছয় ভাই-বোনের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়। তাঁর ভাষ্য, পড়াশোনা করেছেন ঢাকা, লাহোর, প্রাগ ও লন্ডনে। ১৯৫৭ সাল থেকে দেশ-বিদেশে চিকিৎসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৯৭৩ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান এনএইচএসে চিকিৎসক হিসেবে কাজ করেছেন।

সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার পেছনে কোন বিষয়টি কাজ করেছে, সেটা জানালেন ডা: ওসমান গণি বলেন, ‘আমার বাবা ছিলেন গ্রামের মধ্যবিত্ত কৃষক। ছোটবেলায় গ্রামের মানুষের অনেক কষ্ট দেখেছি।  তখন স্বাস্থ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা ও আবাসনের চরম অভাব ছিল। লন্ডনে চিকিৎসা পেশায় যুক্ত হওয়ার পরও গ্রামের মানুষের কথা মনে পড়ত। সেই তাগিদ থেকেই লন্ডনে থাকতেই কাজ শুরু করি। শিকড় আমাকে টানত। ঠিক করেছিলাম, জীবনের বাকি সময় গ্রামের মানুষের সঙ্গে কাটাব। জীবনে যা অর্জন করেছি, তার একটি অংশ মানুষের কল্যাণে ব্যয় করে যেতে চাই।’

আপনার মতামত লিখুন

Daily Joypur Barta

শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬


জীবনে যা অর্জন করেছি,তার একটি অংশ মানুষের কল্যাণে ব্যয় করে যেতে চাই

প্রকাশের তারিখ : ১০ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

ডা: ওসমান গণি দীর্ঘ কর্মজীবন কাটিয়েছেন লন্ডনে। শিকড়ের টানে ২০২১ সালে সেই জীবন ছেড়ে জয়পুরহাটের আক্কেলপুর উপজেলার নিজ গ্রাম মনইল-কানুপুরে ফিরে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন তিনি। দেশে ফেরার আগেই লন্ডনে বসে গ্রামের মানুষের জন্য বিভিন্ন উন্নয়নকাজ শুরু করেছিলেন তিনি। তাঁর অর্থায়নে হয়েছে মসজিদ,কবরস্থান, ঈদগাহ মাঠ, পুকুরঘাট, কমিউনিটি সেন্টার, বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান ভবন ও পাঠাগার। দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য চালু করেছিলেন শিক্ষাবৃত্তিও। 

ডা: ওসমান গণিরর বাড়ির সীমানাপ্রাচীর আর ঘরের দেয়ালে ঝুলছে ফ্রেমে বাঁধানো নানা বাণী। নির্মাণশৈলী ও সাজসজ্জায় বিদেশে কাটানো জীবনের ছাপ স্পষ্ট। এত বড় বাড়িতে একাই থাকেন বাড়ির মালিক ডা: ওসমান গণি সরদার (৯১)। পেশায় চিকিৎসক। তাঁকে দেখভালের জন্য আছেন দুজন গৃহকর্মী। স্ত্রী ও সন্তানেরা এখনো লন্ডনে।

ডা: ওসমান গণি দীর্ঘ কর্মজীবন কাটিয়েছেন লন্ডনে। সেখানেই থেকে যাওয়ার সুযোগ ছিল,কিন্তু শিকড়ের টানে ২০২১ সালে সেই জীবন ছেড়ে জয়পুরহাটের আক্কেলপুর উপজেলার নিজ গ্রাম মনইল-কানুপুরে ফিরে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন তিনি। দেশে ফেরার আগেই লন্ডনে বসে গ্রামের মানুষের জন্য বিভিন্ন উন্নয়নকাজ শুরু করেছিলেন তিনি। এখন গ্রামে থেকে সেসব কাজ নিজেই তদারক করছেন।

ডা: ওসমান গণি বলেন, এসব কাজে অন্য কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের অর্থসহায়তা নেই। নিজের উপার্জিত অর্থেই ব্যয় মিটিয়েছেন। তাঁর হিসাবে, এ পর্যন্ত খরচ হয়েছে ২৫ থেকে ৩০ কোটি টাকা। লন্ডনে থাকতেই নিজের নামে ডা. ওসমান গণি সরদার ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তবে ফাউন্ডেশনে তেমন অর্থসহায়তা না পাওয়ায় নিজের অর্থেই কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন বলে জানান। 

মনইল-কানুপুর ও আশপাশের এলাকায় তাঁর অর্থায়নে হয়েছে মসজিদ, কবরস্থান, ঈদগাহ মাঠ, পুকুরঘাট, কমিউনিটি সেন্টার, বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান ভবন ও পাঠাগার। চিকিৎসাসেবার জন্য প্রতিষ্ঠা করেছেন ডা. ওসমান গণি পল্লী ক্লিনিক (যেখানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বিভিন্ন ধরনের রোগী দেখে থাকেন)। দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য চালু করেছিলেন শিক্ষাবৃত্তিও।

এসব প্রকল্পের মধ্যে সবচেয়ে বড়গুলোর একটি গ্রামের মসজিদ। ডা: ওসমান গণি ও স্থানীয় বাসিন্দাদের তথ্য অনুযায়ী, নির্মাণকাজে এ পর্যন্ত প্রায় আট কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। কাজ এখনো চলছে। এ কাজেও অন্য কারও কাছ থেকে অর্থ নেওয়া হয়নি বলে দাবি তাঁর। গ্রামের বাইরেও কাজ করেছেন এই চিকিৎসক। আক্কেলপুর পৌরশহরে তাঁর অর্থায়নে তৈরি হয়েছে আক্কেলপুর আদর্শ ক্লাব ও পাঠাগারের নতুন ভবন। 

ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক রাব্বি হায়দার চৌধুরী জানান, ব্রিটিশ আমলে প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানটির পুরোনো ভবন ছিল আধা পাকা। ডা: ওসমান গণি আদর্শ কমিউনিটি সেন্টার কাম আদর্শ ক্লাব নামে ভবনটি পুনর্নির্মাণ করে দিয়েছেন। 

কানুপুর উচ্চবিদ্যালয়ে বিজ্ঞান ভবন, পাঠাগার ও হলরুম করে দিয়েছেন। বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, কৃতী শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় সহায়তার পাশাপাশি দরিদ্র মানুষের বাড়িঘর নির্মাণেও সহযোগিতা করেন ডা: ওসমান গণি। মেধাবী ও দরিদ্র শিক্ষার্থীদের জন্য ২০১৩ সালে চালু করেছিলেন শিক্ষাবৃত্তি। কয়েক বছর বন্ধ থাকার পর আবার কার্যক্রম শুরু হয়েছে।

গ্রামের মানুষের চিকিৎসার জন্য প্রতিষ্ঠিত পল্লীক্লিনিক একসময় নিজেই রোগী দেখতেন ডা: ওসমান গণি। বয়সের কারণে এখন নিয়মিত সেখানে বসতে পারেন না। তবে রোগীরা বাড়িতে গেলে পরামর্শ দেন। প্রয়োজনে ওষুধ কেনার জন্য অর্থসহায়তাও দেন।

ডা: ওসমান গণির ছোট ভাই বীর মুক্তিযোদ্ধা ও অবসরপ্রাপ্ত কলেজ শিক্ষক নজরুল হায়দার বলেন, ‘আমার বড় ভাই লন্ডনে থাকা অবস্থায় গ্রামের মানুষদের নিয়ে ভাবতেন। সেই পরিকল্পনা থেকেই কাজ করেছেন। প্রকল্পগুলো তিনি নিজেই তদারক করেছেন।

আক্কেলপুর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও উপজেলা বিএনপির সভাপতি কামরুজ্জামান কমল বলেন, ডা: ওসমান গণি নিজের গ্রামের মানুষের জন্য ক্লিনিক,কমিউনিটি সেন্টারসহ নানা উন্নয়নকাজ করেছেন। 

মনইল-কানুপুর গ্রামের এক মধ্যবিত্ত কৃষক পরিবারে জন্ম ওসমান গণির। ছয় ভাই-বোনের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়। তাঁর ভাষ্য, পড়াশোনা করেছেন ঢাকা, লাহোর, প্রাগ ও লন্ডনে। ১৯৫৭ সাল থেকে দেশ-বিদেশে চিকিৎসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৯৭৩ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান এনএইচএসে চিকিৎসক হিসেবে কাজ করেছেন।

সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার পেছনে কোন বিষয়টি কাজ করেছে, সেটা জানালেন ডা: ওসমান গণি বলেন, ‘আমার বাবা ছিলেন গ্রামের মধ্যবিত্ত কৃষক। ছোটবেলায় গ্রামের মানুষের অনেক কষ্ট দেখেছি।  তখন স্বাস্থ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা ও আবাসনের চরম অভাব ছিল। লন্ডনে চিকিৎসা পেশায় যুক্ত হওয়ার পরও গ্রামের মানুষের কথা মনে পড়ত। সেই তাগিদ থেকেই লন্ডনে থাকতেই কাজ শুরু করি। শিকড় আমাকে টানত। ঠিক করেছিলাম, জীবনের বাকি সময় গ্রামের মানুষের সঙ্গে কাটাব। জীবনে যা অর্জন করেছি, তার একটি অংশ মানুষের কল্যাণে ব্যয় করে যেতে চাই।’


Daily Joypur Barta



কপিরাইট © ২০২৬ Daily Joypur Barta । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত